২০১৯ সালের ২ মে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মৃত্যুর ৫০০ বছর পূর্ণ হলো। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অসংখ্য সমালোচক তাকে সব শিল্পীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। লিওনার্দো নিজেও হয়তো এ দাবির সঙ্গে দ্বিমত করতেন না।
২০১৭ সালে তার ‘সালভাতোর মুন্দি’ চিত্রকর্মটি কিনে নেওয়া হয় ৩৪৫ মিলিয়ন পাউন্ডে, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ দামে কেনা শিল্পকর্ম। যদিও এর অবস্থা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে এবং অনেকে এর আসলেই লিওনার্দোর চিত্র কিনা, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
তবুও লুভর যেভাবে এই চিত্রকর্মটিকে তাদের আসন্ন লিওনার্দো প্রদর্শনীতে রাখার ঘোষণা দিয়েছে, তা এসব সমালোচকদের অবস্থানকে দুর্বল করে।বিখ্যাত শিল্প আবিষ্কারের পেছনে বিপুল অর্থ জড়িয়ে থাকলে তা নিয়ে সংশয়ের ঐতিহ্য রয়েছে। যেমন রুবেনসের ‘স্যামসন ও ডেলাইলা’-এর ক্ষেত্রেও সমালোচনা থেমে থাকেনি।
অবশ্য “সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী” বা “সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম” বলে আদতে কিছুই নেই। তবুও লিওনার্দো যে ইতিহাসের মহান শিল্পীদের একজন, তা অস্বীকার করা কঠিন। আর ‘মোনালিসা’ আজও সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত চিত্রকর্ম। বিস্ময়করভাবে বহু সমালোচনার যুগেও লিওনার্দোর খ্যাতি কখনো কলুষিত হয়নি।
ফ্রান্সের রাজা ফ্রাঁসোয়া প্রথম বলেছিলেন, “লিওনার্দোর মতো আর কেউ জন্মায়নি, শিল্পে যেমন, দর্শনেও তেমন।” গিয়র্জিও ভাসারি লিখেছিলেন, “মাঝেমধ্যে প্রকৃতি এমন এক সৌন্দর্য, সৌজন্য ও প্রতিভার সমাহার সৃষ্টি করে যা স্বর্গীয় মনে হয়। লিওনার্দো তেমনই এক অলৌকিক সৃষ্টি।”
আর্নস্ট গমব্রিচ বলেছিলেন, “মানবজ্ঞান এমন কোনো ক্ষেত্র ছিল না যেখানে লিওনার্দোর ছোঁয়া পৌঁছেনি। শারীরবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা, যান্ত্রিক প্রকৌশল, জলবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা, আলোকবিদ্যা সবই তার দ্বারা রূপান্তরিত হয়েছিল। এমন বিস্ময়কর প্রতিভা বিরল।”
তবে একটি সীমাবদ্ধতা ছিল যা লিওনার্দো কখনো অতিক্রম করতে পারেননি, অপূর্ণতা ও অনির্ভরযোগ্যতা। তার মন এত বিস্তৃত ছিল যে এক বিষয়ের গভীরে ঢোকার আগেই নতুন কিছুর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়তেন। অনেক কিছু পরিকল্পনা করতেন, কিন্তু খুব কমই শেষ করতেন।
ভাসারি লিখেছিলেন, “লিওনার্দো বহু কিছু শুরু করতেন, কিন্তু শেষ করতেন না। কারণ তিনি এমন এক উৎকর্ষ কল্পনা করতেন যা বাস্তবে হাত দিয়ে রূপ দেওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল।”
যেমন আজ ফাইন আর্ট আর অ্যাপ্লায়েড আর্টের সীমারেখা মুছে গেছে, রেনেসাঁ যুগের শিল্পীরাও শুধু চিত্র বা ভাস্কর্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। লিওনার্দো নিজেও মিলানের ডিউক লুডোভিকো স্পোর্জার দরবারে চাকরি চেয়েছিলেন সৈন্যবাহিনীর উন্নয়নের পরিকল্পনার মাধ্যমে, শিল্পী পরিচয়টা যেন ছিল শুধু বাড়তি যোগ।
তবে লিওনার্দো ছিলেন রাজদরবারের এক অলঙ্কার। তার সৌন্দর্য, শিষ্টাচার ও বুদ্ধিমত্তা সেই সময়েও প্রশংসিত হয়েছিল। ফলে ছবি আঁকার সময় হয়তো তার হাতে খুব কমই ছিল।
এবং যতগুলো ছবি তিনি একেছেন, তার অনেকগুলোই অসম্পূর্ণ বা খারাপ অবস্থায়। ‘দ্য লাস্ট সাপার’ একইসাথে বিখ্যাত এবং দুর্ভাগ্যজনকতার উদাহরণ।লিওনার্দো রঙের নতুন ভঙ্গি প্রয়োগ করতে গিয়ে শুকনো দেয়ালে গ্লেজ ব্যবহার করেন, যা সময়ের সঙ্গে ভেঙে পড়ে এবং বহুবার দুর্বল রেস্টোরেশনের শিকার হয়।
তবুও এত সীমাবদ্ধতার মাঝেও তার প্রতিভা এমন যে তা অস্বীকার করা সম্ভব নয়। তার অসম্পূর্ণতা, তার ভগ্ন প্রতিশ্রুতি সবই এক আশ্চর্য আবেগময় জাদুতে মোড়া।
ভাসারি যেমন বলেছিলেন, লিওনার্দোর এই অসম্পূর্ণতা মনোযোগহীনতার জন্য নয়, বরং অতিমাত্রায় মনোযোগের জন্য। তার লেখাগুলো পড়লে বোঝা যায় তিনি একেক সময় একেক বিষয়ের প্রতি গভীর নিষ্ঠা দেখিয়েছেন। অপটিক্স, তরলবিদ্যা, ভূতত্ত্ব, শারীরবিদ্যা একটি বিশাল জগতকে তিনি নিজস্ব চোখে আবিষ্কার করতে চেয়েছেন। কিন্তু সেই জ্ঞানের ভারই যেন তাকে আটকে রেখেছে। চিত্রশিল্প একটি সংক্ষিপ্ত প্রকাশভঙ্গি, অথচ লিওনার্দো চেয়েছেন প্রতিটি আঁচড়ে জগৎকে বিশ্লেষণ করে ফুটিয়ে তুলতে। কিন্তু সেই চেষ্টা, মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব।
অনেকে তাকে রেনেসাঁর মানুষ বললেও, তিনি ছিলেন আত্ম-শিক্ষিত, লাতিন ভাষায় দুর্বল এবং প্রাচীন ক্লাসিক সাহিত্য নিয়ে আগ্রহহীন। তার বিজ্ঞানচর্চা ছিল অনেক বেশি মধ্যযুগীয় পণ্ডিতদের চিন্তায় প্রভাবিত।
শিল্পের ক্ষেত্রে অবশ্য তিনি রেনেসাঁর আত্মা ধারণ করেছিলেন। চার শতকের দার্শনিক, সাহিত্যিক ও বৈজ্ঞানিক বিতর্কের সম্মিলন, মধ্যযুগীয় রাজদরবার সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনার মিশ্রণে গড়া সেই সময়ের চূড়ান্ত রূপকার ছিলেন তিনি।
তার চিত্রভাষা যত জটিলই হোক তাতে ছিল এক অদ্বিতীয় শক্তি ও সূক্ষ্মতা। তার সেরা কাজের সৌন্দর্য এতটাই অনন্য যে তার শিষ্যরাও তা ধারণ করতে পারেননি। বরং তার প্রভাব অন্যদের কাজে আরও সূক্ষ্মভাবে প্রস্ফুটিত হয়েছে। রাফায়েলের ক্ষেত্রে লিওনার্দোর প্রভাব তাকে ছাপিয়ে না গিয়ে বরং সমৃদ্ধ করেছে, বিশেষ করে তার ‘আলবা মাদোন্না’ ছবিতে।
এই ছিল এক বিরল প্রতিভা, তবুও অপূর্ণতায় পূর্ণ। যেন গ্রিক ট্র্যাজেডির কোনো নায়কের মতো, লিওনার্দোর দুর্ভাগ্যের মূল কারণ তার অতিরিক্ত প্রতিভাই। সেই প্রতিভাই তার সামনে এমন এক উচ্চতা নির্মাণ করেছিল, যাকে ছুঁতে গিয়েই বারবার ব্যর্থতায় ফিরেছেন তিনি। তিনি হয়তো আদর্শ রেনেসাঁ পারসন’ ছিলেন না, কিন্তু শিল্পের জগতে তিনি এক গভীর ও সার্বজনীন মানবিকতার প্রতীক।


