বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। সেই স্বাধীনতার স্বপ্ন ছিল একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠন, যেখানে থাকবে না দমন-পীড়ন কিংবা বাকস্বাধীনতার সংকোচন। অথচ স্বাধীনতার পর পঞ্চাশ বছরের ব্যবধানে দুটি আগস্ট মাস ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। এই দুই ঘটনাতেই ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটেছে একতরফা ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনের মধ্য দিয়ে।
১৯৭২ সালের সংবিধানে ঘোষিত চার মূলনীতি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ—ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি। কিন্তু স্বাধীনতার অল্প সময় পর থেকেই শুরু হয় ভিন্নমতের ওপর দমন-পীড়ন। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে শেখ মুজিব বাকশাল গঠন করে একদলীয় শাসন চালু করেন এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রুদ্ধ করে দেন। এরপর ১৫ আগস্ট সপরিবারে শেখ মুজিব নিহত হলে রাষ্ট্রীয় শাসনে আসে বড় ধরনের পরিবর্তন। খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন এবং সামরিক আইনের মাধ্যমে একনায়কতান্ত্রিক প্রেসিডেন্সিয়াল কাঠামো তৈরি করেন।
এই সময়ই ভারতের একাংশ থেকে সিআইএ ও চীনের সম্পৃক্ততা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ পায়। ভারতের গণমাধ্যম ও রাজনীতিবিদরা ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকার অভিযোগ তোলে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র তা অস্বীকার করে।
১৫ আগস্টের পর দেশের বাজারে আচমকা মূল্যস্ফীতি হ্রাস পায়, চালসহ নিত্যপণ্যের দাম কমে আসে। মোশতাক সরকার শ্বেতপত্র প্রকাশ করে শেখ মুজিব সরকারের আমলে দুর্নীতি, পরিকল্পনাহীনতা ও আর্থসামাজিক অনিয়মের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরে নিজেদের প্রশাসনকে একেবারে জবাবদিহিমূলক হিসেবে উপস্থাপন করে। যদিও এই সরকারের গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ নেয়নি। সেনাবাহিনীর প্রভাব, মতপ্রকাশের দমন এবং রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ থাকার ফলে সরকারটি তিন মাসও টিকতে পারেনি। নভেম্বরে ঘটে যায় দুই দফা অভ্যুত্থান, যার মধ্যে ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
প্রায় ৫০ বছর পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঘটে আরেক রাজনৈতিক পালাবদল। দীর্ঘ দেড় দশকের শাসন শেষে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার পতন ঘটে। এর পেছনে ছিল একাধিক বিতর্কিত নির্বাচন, রাজনৈতিক দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকোচন এবং ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ। কোটা সংস্কার আন্দোলন দমন ও ইন্টারনেট শাটডাউনের মধ্যে আন্দোলন তীব্র রূপ নেয় এবং শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালায়। দেশ কয়েকদিন কার্যত প্রশাসনহীন থাকে।
৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনে দেশে ১১.৬৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য এবং সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ছিল প্রকট। সরকার পতনের পর কিছুটা স্বস্তি দেখা দেয় বাজারে। তবে একই সময়ে পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির মোকাবেলায় সরকারকে হিমশিমও খেতে হয়।
শেখ হাসিনার পতনের পর আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রশংসা করে। তবে ভারত সরকার সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কথা জানায়। হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়া দিল্লির জন্য কূটনৈতিক দুশ্চিন্তা তৈরি করে। এর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব জোরালো হয়। পরবর্তীতে ভারত অন্তর্বর্তী সরকারকে শুভেচ্ছা জানালেও দুই দেশের সম্পর্কে থেকে যায় অস্বস্তিকর দূরত্ব।
পরে গঠিত দুর্নীতিবিষয়ক শ্বেতপত্রে উঠে আসে ২০০৯–২০২৪ সময়কালে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার, ‘চামচা পুঁজিবাদ’ থেকে ‘চোরতন্ত্রে’ রূপান্তরের চিত্র। অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণা দেয়, ২০২৬ সালের মধ্যে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করা হবে।
অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান ছিল গণতন্ত্র রক্ষার একটি নিরপেক্ষ আন্দোলন, যার লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যতে কোনো একনায়কতন্ত্রের পুনরাবৃত্তি না হওয়া। তবে তিনি সতর্ক করেন যে এই উত্তরণ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে মূলধারার রাজনীতির প্রক্রিয়ায় এই অভ্যুত্থানের আদর্শ কতটা স্থান পায় তার উপর। এক বছর পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যত বড় কোনো কাঠামোগত সংস্কার হয়নি। বিনিয়োগ স্থবির, কর্মসংস্থানের সংকট রয়েছে এবং প্রশাসনিক সংস্কারে অগ্রগতি ধীরগতির। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, শিক্ষাঙ্গনের স্থিতিশীলতা এবং বিচারব্যবস্থা সংস্কার এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো এখনো গুরুত্ব পায়নি।
সাবেক উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান এক নির্মোহ বিশ্লেষণে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সুর মিলালেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তারা আমলা শাসনের উপর নির্ভর করছে, যা এক প্রকার স্ববিরোধিতা। তিনি অভিযোগ করেন, সংস্কার কার্যক্রমে জনগণের অংশগ্রহণ কম এবং সুপারিশগুলো এসেছে আমলাতান্ত্রিক চ্যানেল থেকে। সবচেয়ে বেশি দ্রুততার সঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে এক আমলা গোষ্ঠী, যারা মাঠের বাস্তবতা নয়, বরং নিজেদের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেয়। এক বছরের এই সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার কিছু ভালো উদ্যোগ নিলেও তা এখনো জনমানুষের প্রত্যাশা পূরণে যথেষ্ট নয়। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায় এই অভ্যুত্থান কি কেবল নেতৃত্ব পরিবর্তনের ঘটনা হয়ে থাকবে, নাকি তা সত্যিকারের গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে?


