অর্ধশতবছর আয়ুষ্কাল নিয়ে স্পেসক্রাফটে রেডিওআইসোটোপ ব্যাটারি কিভাবে কাজ করে?

স্পেসক্রাফটকে সৌর শক্তি দ্বারা চালিত করা প্রথমে মনে হতে পারে সহজ কাজ, কারণ পৃথিবীতে সূর্যের আলো কতটা শক্তিশালী তা আমরা প্রত্যাহিকভাবে অনুভব করি। পৃথিবীর কাছাকাছি স্পেসক্রাফটগুলো সৌর প্যানেল ব্যবহার করে সূর্য থেকে প্রয়োজনীয় শক্তি সংগ্রহ করে, যা তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি চালানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে যত বেশি মহাকাশের দিকে যাই, সূর্যের আলো তত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সৌর প্যানেল দিয়ে শক্তি উৎপাদন করা আরও কঠিন হয়ে যায়। এমনকি সূর্যকেই কেন্দ্র হিসেবে নিয়ে চাঁদ বা মঙ্গল রোভারের মতো স্পেসক্রাফটগুলোর জন্য বিকল্প শক্তির উৎস প্রয়োজন।

মহাকাশের এই চরম পরিবেশে যেখানে স্পেসক্রাফটগুলোকে সূর্যের তীব্র বিস্ফোরণ, রেডিয়েশন এবং ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট উপরে কিংবা নিচে তাপমাত্রার বৈচিত্র্য সহ্য করতে হয়, তখন প্রযুক্তিবিদরা কিছু উদ্ভাবনী সমাধান তৈরি করেছেন যা মহাকাশের অন্যতম দূরবর্তী মিশনগুলিকে চালিত করতে সাহায্য করে। তাহলে মহাকাশের বাইরে এবং সোলার সিস্টেমের বাইরের মিশনগুলোকে কীভাবে শক্তি প্রদান করা হয়? এর উত্তর হলো ১৯৬০ এর দশকে উদ্ভাবিত একটি প্রযুক্তি, যা দুই শতাব্দী আগের বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা রেডিওআইসোটোপ থার্মোইলেকট্রিক জেনারেটর (RTGS)।

RTGS মূলত পরমাণু শক্তি দ্বারা চালিত ব্যাটারি। কিন্তু সেটি আমাদের টিভি রিমোটের AAA ব্যাটারির মতো নয়, RTGS মহাকাশে প্রায় কয়েকশ’ মিলিয়ন থেকে এক বিলিয়ন মাইল দূরে থেকেও কয়েক দশক পর্যন্ত শক্তি সরবরাহ করতে পারে। রেডিওআইসোটোপ থার্মোইলেকট্রিক জেনারেটরগুলি রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া ব্যবহার করে না, পরিবর্তে এগুলি রেডিওঅ্যাকটিভ উপাদানের বিস্ফোরণ দ্বারা তাপ এবং শেষে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে। যদিও এই ধারণাটি নিউক্লিয়ার শক্তি প্ল্যান্টের সাথে তুলনীয় মনে হয় RTGS আলাদা একটি নীতি অনুসরণ করে। RTGS অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্লুটোনিয়াম-২৩৮ ব্যবহার করে শক্তির উৎস হিসেবে, যেগুলো নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের জন্য উপযুক্ত নয়, কারণ এটি বিভাজন প্রতিক্রিয়া স্থায়ী করে না। প্লুটোনিয়াম-২৩৮ একটি অস্থির উপাদান, যা রেডিওঅ্যাকটিভ ধ্বংস প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে।

রেডিওঅ্যাকটিভ ধ্বংস তখন ঘটে যখন একটি অস্থির পারমাণবিক নিউক্লিয়াস স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং এলোমেলোভাবে কণিকা এবং শক্তি নির্গত করে একটি আরও স্থিতিশীল কনফিগারেশনে পৌঁছানোর জন্য। এই প্রক্রিয়াটি প্রায়ই উপাদানটিকে একটি নতুন উপাদানে পরিবর্তন করে, কারণ নিউক্লিয়াস প্রোটন হারাতে পারে। যখন প্লুটোনিয়াম-২৩৮ ধ্বংস হয়, তখন এটি অ্যালফা কণিকা নির্গত করে, যার মধ্যে দুটি প্রোটন এবং দুটি নিউট্রন থাকে। প্লুটোনিয়াম-২৩৮-এ মধ্যে ৯৪টি প্রোটন থাকে, যখন একটি অ্যালফা কণিকা নির্গত করে, তখন এটি দুটি প্রোটন হারায় এবং ইউরেনিয়াম-২৩৪ তে পরিণত হয়, যার মধ্যে থাকে ৯২টি প্রোটন।

অ্যালফা কণিকাগুলি প্লুটোনিয়ামের চারপাশে থাকা উপকরণগুলির সাথে সংযোগ স্থাপন করে এবং তাদের তাপ প্রেরণ করে।পুটোনিয়াম-২৩৮ এর রেডিওঅ্যাকটিভ ধ্বংসের ফলে পর্যাপ্ত শক্তি মুক্তি পায়, যা নিজেই লাল হয়ে ওঠে এবং এই শক্তিশালী তাপই RTG গুলি চালাতে ব্যবহার করা হয়। রেডিওআইসোটোপ থার্মোইলেকট্রিক জেনারেটরগুলি একটি নীতি ব্যবহার করে, যাকে সিবেক প্রভাব বলা হয়। ১৮২১ সালে জার্মান বিজ্ঞানী থমাস সিবেক আবিষ্কার করেন। সিবেক প্রভাবের মাধ্যমে, দুটি ভিন্ন ধরনের পরিবাহী উপাদান একসাথে যুক্ত হয়ে একটি তাপমাত্রার পার্থক্য সৃষ্টি হলে সেই পার্থক্য শক্তি তৈরি করতে পারে।

একটি বেসিক RTG এর মধ্যে প্লুটোনিয়াম-ডাইঅক্সাইড আকারে কঠিন সিরামিক অবস্থায় একটি প্লুটোনিয়াম-২৩৮ কন্টেইনার থাকে, যাতে দুর্ঘটনা ঘটলে অতিরিক্ত সুরক্ষা নিশ্চিত হয়। প্লুটোনিয়াম উপাদানটি একটি সুরক্ষিত ফয়েল ইনস্যুলেশন দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে এবং একটি বড় থার্মোকপল সমন্বয় রয়েছে। এই RTG এবং থার্মোকপলের একপাশ গরম রাখা হয় ৯৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৫৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপমাত্রায় এবং অন্যপাশ মহাকাশের সাথে এক্সপোজড থাকে, যার তাপমাত্রা শূন্যের অনেক নিচে হতে পারে। এই শক্তিশালী তাপমাত্রার পার্থক্য জঞএ কে শক্তি উৎপন্ন করতে সাহায্য করে। NASA-এর বেশ কিছু স্পেস মিশনে RTGS গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মঙ্গল রোভারের কিউরিওসিটি এবং পারসিভারেন্স, ২০১৫ সালে প্লুটোর কাছে যাওয়া নিউ হরাইজন্স স্পেসক্রাফট, এ সবগুলোতে RTGS, ব্যবহার করেছে।

তবে Voyager মিশন দুটি সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। NASA ১৯৭৭ সালে Voyager 1 এবং Voyager 2 উৎক্ষেপণ করে, যেগুলো সৌর সিস্টেমের বাইরের দিকে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে। আজ প্রায় ৫০ বছর পর এই স্পেসক্রাফট দুটি এখনও সক্রিয় এবং পৃথিবীতে গবেষণা তথ্য পাঠাচ্ছে। Voyager 1 এবং Voyager 2 বর্তমানে পৃথিবী থেকে ১৫.৫ বিলিয়ন মাইল এবং ১৩ বিলিয়ন মাইল (প্রায় ২৫ বিলিয়ন কিলোমিটার এবং ২১ বিলিয়ন কিলোমিটার) দূরে অবস্থান করছে এবং তাদের জঞএং এখনও তাদেরকে নিরবচ্ছিন্ন শক্তি সরবরাহ করছে। এই স্পেসক্রাফটগুলি RTG প্রযুক্তির উদ্ভাবনের পরিণতি এবং মানুষের প্রকৌশল দক্ষতার সাক্ষী।




LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন