জীবনের শুরু থেকে আমরা একটা নির্দিষ্ট ছক অনুসরণ করি—প্রথম শব্দ, প্রথম হাঁটা, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মজীবন, তারপর বিয়ে। কিন্তু এই ‘হ্যাপিলি এভার আফটার’-এর স্বপ্ন অনেকের জন্য এক অদৃশ্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। শৈশবে অভিজ্ঞ হওয়া অব্যক্ত মানসিক ক্ষতগুলো যেন এক নিরব স্যুটকেসে ভরে থাকে, যা হঠাৎই বৈবাহিক জীবনের মধ্যখানে উন্মোচিত হয়—কখনো ঝগড়ার মধ্য দিয়ে, কখনো নীরবতার।
আমরা যখন ‘নিজের সেরা ভার্সন’ হয়ে ওঠার চেষ্টায় থাকি, তখন সেই শিশুদের মতো দুর্বলতাগুলো চাপা পড়ে যায়। কিন্তু সেই পুরোনো ফাটলগুলো বৈবাহিক জীবনের মধ্যে ঢুকে পড়ে। বিশেষত এমন সমাজে, যেখানে পরিবার আর সংস্কৃতির প্রত্যাশা খুব উচ্চ। বছর গড়াতে গড়াতে সেই ফাটলগুলো আরও গভীর হতে থাকে, যতক্ষণ না কিছু একটা আবার সামনে আসে।
একজন মানুষের মানসিক মানচিত্র গড়ে ওঠে শৈশবের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। পিতামাতার ঝগড়া দেখা, অবহেলিত হওয়া, অবিচার সহ্য করা কিংবা মৌখিকভাবে অবহেলার শিকার হওয়া। সেই মানচিত্রই পরে ভালোবাসা, আস্থা আর বিশ্বস্ততাকে বোঝার উপায় হয়ে ওঠে।
বিয়ের শুরুটা অনেক সময় স্বপ্নের মতো। একটা হানিমুন পর্ব, যেখানে সব কিছুই সুন্দর আর নির্ভার লাগে। কিন্তু চিকিৎসা না পাওয়া পুরনো ক্ষতগুলো ধীরে ধীরে ফিরে আসে।
উদাহরণস্বরূপ, জীবনসঙ্গী যদি সহকর্মীর সঙ্গে কথা বলেন, তাতে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। ছোটখাটো ঝগড়া দেখা দিতে পারে ডিনারের মেনু নিয়ে, অথচ ভেতরে ভেতরে সেটা অবহেলার আশঙ্কা, ত্যাগের ভয় কিংবা পরিচয়ের সংকটে পরিণত হয়।
মনোবিকাশ ফাউন্ডেশনের মনোচিকিৎসক ড. আবদুল হামিদ বলেন, “মানুষ অতীতের মানসিক মানচিত্র অনুযায়ী নতুন সম্পর্কের ফর্ম গড়ে তুলতে চায়।” এই মানসিক কাঠামো থেকেই বৈবাহিক জীবনে সংঘর্ষের উৎস সৃষ্টি হয়। ঢাকার মতো শহরে, যেখানে সামাজিক প্রত্যাশা বিশাল এবং আত্মীয়-স্বজনের মতামত প্রায়শই দাম্পত্যে হস্তক্ষেপ করে, সেখানে মানসিক দুর্বলতা প্রকাশ করাটাই এক ধরনের ‘পরাজয়’ মনে হয়।
এখনো অনেকেই এই সংকটের কথা স্বীকার না করে একসঙ্গে থাকার ভান করে যান। বাচ্চাকে স্কুলে নেওয়া, গৃহস্থালির কাজ, আত্মীয়দের সামনে সম্পর্কের মুখোশ ধরে রাখা—এই সবই এক ধরনের নিজেকে রক্ষা করার প্রয়াস। এই নিঃশব্দ যুদ্ধই জন্ম দেয় মানসিক বিচ্ছিন্নতার, যা প্রায়শই ভুল বোঝাবুঝি ও পরস্পরের উপর নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষায় রূপ নেয়।
বাংলাদেশে শৈশবকালীন ট্রমা খুব সাধারণ ব্যাপার। দারিদ্র্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, লিঙ্গ বৈষম্য কিংবা পুরুষতান্ত্রিক পরিবারব্যবস্থা এসব ট্রমার পেছনের বড় কারণ। শিশুদের অনেকেই বিশ্বাস করতে শেখে, তাদের চাহিদা তুচ্ছ, তাদের অস্তিত্বই অন্যের বোঝা।
এই অব্যক্ত ক্ষতগুলো বড় হয়ে আরও জটিল হয়—আত্মসম্মানবোধের সংকট, পরিত্যক্ত হওয়ার ভয়, বা অতিরিক্ত মূল্যায়নের প্রয়োজন তৈরি হয়। বিশেষত যেসব শিশু পিতামাতার মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখেছে, তারা প্রায়ই নিজেকে দোষারোপ করে। ড. হামিদ বলেন, “তারা ভাবে তারা-ই দায়ী এই বিবাদের জন্য।”
এক চাকুরিজীবী বলেন, “আমি অনেকবার আগে চলে এসেছি, কারণ আমি ভয় পাই। আমি জানি না কখন আমাকে আর চাওয়া হবে না। তাই আমি আগেই সরে যাই, যেন কষ্টটা একটু কম হয়।” এই ধরনের মনোভাবের মূলেও থাকে শৈশবের পরিত্যাগের অভিজ্ঞতা।
বাংলাদেশি নারীরা শারীরিক অবমাননা, গায়ের রঙ নিয়ে কটাক্ষ, এবং চরম সামাজিক বিধিনিষেধের মুখোমুখি হন। পুরুষদের ক্ষেত্রে আবেগ দেখানো দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সংযমই অনেক পুরুষকে দাম্পত্য জীবনে মানসিকভাবে অনুপলব্ধ করে তোলে।
এক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বলেন, “আমি জানি আমি আমার স্ত্রীকে ভালোবাসি, কিন্তু সেটা প্রকাশ করা কঠিন। ছোটবেলায় কাঁদলে দুর্বল বলা হতো, রাগ দেখালে খারাপ ছেলে। আমার আবেগগুলো চাপা পড়েছে। এখন ভালোবাসাও প্রকাশ করতে পারি না।”
সুস্থ সম্পর্ক গড়তে হলে একে অপরকে শত্রু নয়, বরং একে অপরের ভেতরের ক্ষত বোঝার চেষ্টা করা জরুরি। চিকিৎসক হামিদের মতে, “তর্ক নয়, কৌতূহল দিয়ে কথা বলা, আত্মপক্ষ সমর্থন নয়, বরং সততার সাথে প্রকাশ করা—এইভাবেই নিরাময় শুরু হয়।”
ঢাকার পাল্টে যাওয়া বাস্তবতা, নতুন প্রজন্মের মনোভাব এবং থেরাপির প্রতি আগ্রহ এক ধরণের আশার সঞ্চার করছে। কিন্তু সামাজিক কলঙ্ক এখনো বিদ্যমান। মানসিক স্বাস্থ্যকে এখনো বিলাসিতা মনে করা হয়।
শেষ পর্যন্ত বিয়ে শুধু দুটি জীবন নয়, দুটি অতীতেরও সম্মিলন। যতক্ষণ না সেই অতীতকে স্বীকার করা হয়, ভবিষ্যৎ থাকে এমন ভূতেদের কাছে বন্দী, যাদের আমরা কখনো নাম দিইনি।
ভালোবাসা টিকে থাকতে চায়, কিন্তু সেই ভালোবাসা যদি ক্ষতের মাটিতে রোপিত হয়, তবে তার শিকড় শক্ত হয় না। আমাদের উচিত নিজের শৈশবকে মেনে নেওয়া, ভেতরের সেই শিশুটিকে জড়িয়ে ধরা এবং শিখে নেওয়া—আবার কিভাবে বিশ্বাস করা যায়, ভালোবাসা যায় এবং ভালোবাসা পাওয়া যায়।


