গত ছয় মাসে ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় মামলা হয়েছে ১,১৪৫টি, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি। ডাকাতি ও দস্যুতার মামলা দিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র সব সময় বোঝা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পুলিশের কাছে যান না ঝামেলার ভয়ে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে তিন দিন পুলিশি কার্যক্রম ছিল না। পরে ধীরে ধীরে থানাগুলো চালু হয়, পুলিশি কার্যক্রম বাড়তে থাকে, কিন্তু স্বাভাবিক সময়ের মতো পুলিশ সক্রিয় নয় বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন। নগরীর সড়ক থেকে শুরু করে হাইওয়েগুলোতে পুলিশের তৎপরতা খুব একটা চোখে পড়ে না।
আবার নতুন পরিস্থিতিতে পুলিশ কয়েকটি সমস্যায় ভুগছে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোয় পুলিশে নতুন জনবল এসেছে। নতুন আসা পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যরা সংশ্লিষ্ট শহরের অপরাধী ও অপরাধপ্রবণতা সম্পর্কে অভিজ্ঞ নন। অপরাধের খবর জানা ও অপরাধীকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে তাদের সোর্স কম। এ ছাড়া পুলিশে মনোবলের সংকট কাটেনি। গাড়ি, আবাসন ইত্যাদি সমস্যাও আছে। বিশ্লেষক ও পুলিশ কর্মকর্তারা আরও বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শক্তভাবে বিশৃঙ্খলা ও অপরাধ দমন করতে পারছে না। এতে অপরাধীরা মনে করছে, তারা পার পেয়ে যাবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) থানা পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, অভিযানে গেলে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তখন বল প্রয়োগ করা হলে ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা থাকে। এ কারণে পুলিশকে অপরাধীরা এখন আর সেভাবে ভয় পাচ্ছে না। এ কারণেই তারা বেপরোয়া। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাজধানীতে ২৮৯টি মামলায় ৭৫৮ ‘ছিনতাইকারীকে’ গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ১১৫ জনই জামিনে বেরিয়ে গেছেন। অনেক ক্ষেত্রে জামিন পেয়েছে যাচ্ছেন অল্প দিনের মধ্যে।পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা ও অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, কর্মসংস্থানের অভাবও এখন অপরাধ বেড়ে যাওয়ার একটি কারণ।
এলাকাভেদে অপরাধীদের আলাদা আলাদা ধরনও পেয়েছে পুলিশ। পুলিশ বলছে-মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও হাজারীবাগ এলাকার অপরাধীদের বড় অংশের সঙ্গে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। তাদের অনেকে সাম্প্রতিককালে জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়েছেন। গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী ও এর আশপাশের এলাকায় পেশাদার ছিনতাইকারী চক্রের তৎপরতা বেশি। আবার উত্তরার দিকে অল্পবয়সীদের অপরাধ-চক্রের তৎপরতা বেশি লক্ষণীয়। খিলগাঁও, মগবাজার, বাড্ডা ও মহাখালী এলাকায় আবার পেশাদার অপরাধীদের পাশাপাশি মৌসুমি অপরাধীদের তৎপরতা বেশি পেয়েছে পুলিশ।
এদিকে পুলিশ বলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের কিছু আইডি ও পেজ থেকে ধর্ষণ, ছিনতাই ও ডাকাতির বিষয়ে গুজবও ছড়ানো হচ্ছে। ছড়ানো হচ্ছে পুরোনো ভিডিও। ফলে মানুষের মধ্যে বেশি আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। কোনো সূত্র ছাড়াই অপরাধের মনগড়া কিছু পরিসংখ্যান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে। অনেকর মতে, ‘ডেভিল হান্ট’ অভিযানটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বেশি পরিচালিত হচ্ছে বলে দৃশ্যমান। সংঘবদ্ধ অপরাধে যারা জড়িত, তাদের মধ্যে ধারণা জন্মেছে তারা অভিযানের ফোকাসে নেই। এ কারণে অভিযানের পূর্ণ ফল আসেনি।ব্যবসায়ীরা বলছেন – সরকারকে এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। না হলে ঈদের আগে মানুষ ভয়ে কেনাকাটা করতে বের হবেন না। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অর্থনীতির ক্ষতি হবে।


