“দমন-পীড়নকারী ও দুর্নীতিগ্রস্ত হাসিনা সরকারের পতন ঘটানোর পর আমাদের উচিত ছিল গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, সব ধরনের বৈষম্যের অবসান ঘটানো, দেশে সৎ ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা স্থাপন করা, স্বাধীনতা ও অধিকার নিশ্চিত করা, দুর্নীতিমুক্ত ও দক্ষ আমলাতন্ত্র গঠন করা এবং এমন আরও অনেক পরিবর্তন আনা।
কিন্তু, আমরা কি তা করছি? … গণতন্ত্র আমাদের মূল লক্ষ্য বলে আজ আর মনে হচ্ছে না। কারণ, তেমনটা হলে আমরা কি নির্বাচন নিয়ে আরও বেশি আলোচনা করতাম না?
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বারবারই নির্বাচনের সম্ভব্য সময়সীমা বলছেন ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে। শুরু থেকেই তিনি এটা বলছেন। যদি তার মনে হয় জুনে নির্বাচন আয়োজন করা ভালো হবে, তাহলে সেটিই স্পষ্ট করা উচিত এবং সেই অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়া উচিত।
নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে এই অহেতুক বিতর্কের এখন অবসান হওয়া উচিত। কেননা, এই বিতর্কের কারণে সেই মানুষটার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, যাকে আমরা শ্রদ্ধা করি, যার ওপর ভরসা করি। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বিশেষ করে তখন, যখন এটা পরিষ্কার যে তার মন্ত্রিসভার কিছু সদস্য ক্ষমতায় আরও সময় থাকতে চায় এবং সেজন্যই সংস্কারকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে নির্বাচন পেছাতে চাইছে।
… গত ১৫ জানুয়ারির মধ্যে ছয়টি প্রধান সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এরপর পেরিয়ে গেছে চারটি মাস। এতদিনেও কি আমাদের কাছে ঐকমত্যে পৌঁছানো সংস্কারের বিষয়ে পরিষ্কার চিত্র থাকা উচিত ছিল না?…সংস্কার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো সরাসরি নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত। যার কারণে ঐকমত্যের ক্ষেত্রে এমন ধীরগতি অস্বস্তিকর সব প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারকে তাদের দায়িত্বের পরিধি ও মেয়াদের স্থিতিশীলতা সম্পর্কে অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে। তাদের দায়িত্ব ছিল সংস্কার বাস্তবায়ন এবং দ্রুত একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে শাসনভার তুলে দেওয়া।…কিন্তু, মেয়াদ সম্পর্কে এই সরকারের যতটা সচেতন হওয়া উচিত ছিল, ততটা আছে বলে মনে হচ্ছে না।
… ড. ইউনূস কি এই বৈচিত্র্যময় ও ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, অনেক ক্ষেত্রে সরকার পরিচালনায় অভিজ্ঞতাহীন মানুষদের নিয়ে সীমাবদ্ধ সময়ে সুনির্দিষ্ট কার্য সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে গঠিত তার সরকার চালাতে পারবেন?…যেকোনো সংবাদপত্র বা টেলিভিশন চ্যানেল খুললেই দেখা যাবে, নগর জীবন কতটা অনিশ্চিত ও অসাধ্য হয়ে উঠেছে এবং গ্রামীণ জীবন কতটা অনিরাপদ হয়ে গেছে।
… আমাদের মনে হয়, বর্তমান বাস্তবতা এবং সরকারের দৈনন্দিন বিষয়াদি, বিশেষ করে আইন ও শাসন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে অক্ষমতাই আমাদের উত্তর দিয়ে দিচ্ছে।
অবস্থা দৃষ্টে প্রতীয়মান হচ্ছে যে ড. ইউনূসের ব্যক্তিগত মর্যাদা, সুপরিচিত দেশপ্রেম, তার প্রতি জনগণের আস্থা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার প্রতি বিশ্বাসের কারণেই এতসব চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে পারছে। কিন্তু, এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে পারে না। আমাদের সর্বোত্তম বিকল্প হলো নির্বাচিত সরকার গঠন করে গণতন্ত্রের যাত্রা পুনরায় শুরু করা, সেটা যেমনই হোক না কেন।
আমরা জানি, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিকতা ও জনগণের সেবা করার দক্ষতা নিয়ে অনেক সন্দেহ রয়েছে। তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও আমরা সন্দিহান। কারণ, অতীতে তারা চাঁদ হাতে তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে কিছুই করেনি। কিন্তু তারপরও জনপ্রতিনিধি জনগণের ভোটে নির্বাচিত করতে হবে।
কেবলমাত্র একজন ব্যক্তির মর্যাদা ও তার প্রতি আস্থার ভিত্তিতে একটি অনির্বাচিত সরকারকে টিকিয়ে রাখা কোনো জাতির জন্য অগ্রসর হওয়ার পথ হতে পারে না এবং ড. ইউনূসের মতো একজন মানুষের এমন কোনো অবস্থান দীর্ঘদিন সমর্থন করা উচিত না। “


