চাকমা রাজা দেবাশীষ রায়– এখানে এত যে নিরাপত্তার অজুহাত, তাহলে এত গোষ্ঠীর জন্ম হলো কীভাবে? অনেক স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস হলো, পাহাড়ে সন্ত্রাস বন্ধ হোক, এটা কোনো কোনো মহল চায় না। জনমানুষের আরও অভিযোগ, পার্বত্য অঞ্চলের বিবদমান গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত ঘটতে দেওয়া হচ্ছে। – দৈনিক প্রথম আলো’র সাথে সাক্ষাৎকার সংক্ষেপ
… আমার সার্কেল চিফ হওয়ার ৪৭ বছরে কেবল রাঙামাটি শহরে এ ধরনের অন্তত চারটি সহিংসতা হলো। এর মধ্যে ১৯৯২ সালের ২০ মে, ২০১২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ সালের ১০ থেকে ১৩ জানুয়ারি এবং এবারে ২০২৪-এ ২০ সেপ্টেম্বর।… কোনো ঘটনা কিন্তু রাতে হয়নি, দিনদুপুরে হয়েছে। আবার গ্রামে হয়নি, খোদ রাঙামাটি শহরে হয়েছে। … আগের ঘটনাগুলো যাঁরা ঘটিয়েছেন, তাঁরা যদি শাস্তি না পেয়ে থাকেন, তবে এটা কি তাঁদের পক্ষে ভাবা স্বাভাবিক নয় যে এসব করলে কোনোক্রমেই শাস্তি পেতে হয় না।
“… তালিকা যদি করেন, তবে দেখা যাবে ৯০ শতাংশের বেশি ক্ষতি হয়েছে পাহাড়িদের। আর ক্ষতিমূলক কর্মকাণ্ড যাঁরা করেছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে যে তাঁরা পাহাড়ি না, সেটা অঞ্চলের পাহাড়ি-বাঙালি সবাই জানে। … এখানকার নিরাপত্তা বাহিনীসহ যত ধরনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আছে, সবখানে নিরঙ্কুশ বাঙালি প্রাধান্য। অথচ এখানে একটি মিশ্র বাহিনী গড়ে তোলার দাবি দীর্ঘদিনের এবং ১৯৮৯ থেকে এ বিষয়ে আইনি বিধানও রয়েছে। যেখানে পাহাড়ের প্রতিটি জাতিসত্তার মানুষের সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব থাকবে। …সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বাড়ানোর জন্য বিশ্বের নানা দেশে এমন বাহিনী হয়েছে এবং ইতিবাচক ফলও পাওয়া গেছে।
… পার্বত্য চট্টগ্রামে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এমন একটি বাহিনী তৈরি করতে প্রশিক্ষণ দিতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। কেন হয়নি তা, সেই প্রশ্ন তোলা জরুরি। তার মানে কি আমরা ধরে নেব যে সরকার বা কোনো মহল চায় না পাহাড়ে হানাহানি বন্ধ হোক। … এখানে সাধারণ যেসব সহিংসতা হয় বা হচ্ছে, তা পুলিশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ করা উচিত, সামরিক বাহিনীর না। মশা মারতে কামান দাগানোর তো দরকার নেই। দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ তো পুলিশের কাজ। তাদের কাজ তাদের করতে দেন, বিজিবির কাজ বিজিবিকে করতে দেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে যাঁরা সেনা কর্মকর্তা আছেন, তাঁরা সিভিল প্রশাসনের অধীনে কাজ করুক।
… এখানে এত যে নিরাপত্তার অজুহাত, তাহলে এত গোষ্ঠীর জন্ম হলো কীভাবে? এখানে পার্বত্য অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্তদের ব্যর্থতার প্রশ্ন চলে আসে। তবে অনেক স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস হলো, পাহাড়ে সন্ত্রাস বন্ধ হোক, এটা কোনো কোনো মহল চায় না। জনমানুষের আরও অভিযোগ, পার্বত্য অঞ্চলের বিবদমান গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত ঘটতে দেওয়া হচ্ছে।… পাহাড়ের শহরাঞ্চলে বাঙালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় শতভাগ বাঙালি। তাহলে ক্ষমতার ভারসাম্য কোথায় থাকল? এসব বাহিনীর সদস্যদের কাছ থেকে কি পাহাড়ি-বাঙালি সংঘাতে নিরপেক্ষতা অবলম্বন সম্ভব? ইতিহাস তো তা বলে না!
“… পার্বত্য চুক্তিকে অবশ্যই বাস্তবায়ন করা উচিত।” এর মৌলিক দিকের বাস্তবায়ন হয়নি বলেই তো এত সমস্যা। তবে এই চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের স্পৃহা বা স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে পারে পুরোপুরি, তা বলা ঠিক হবে না। … এ চুক্তিতে যতটা আঞ্চলিক স্বশাসন দেওয়া হয়েছে, তা নগণ্য। আমরা যদি উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর দিকেই তাকাই, সেখানকার স্বায়ত্তশাসন কিন্তু অনেক বিস্তৃত। সেখানকার স্বায়ত্তশাসিত জেলাগুলোর স্বায়ত্তশাসন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। তারপরও পার্বত্য চুক্তিতে জেলা পরিষদগুলোকে যেসব ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ভূমি ও পুলিশ-সংক্রান্ত, তা আজও বাস্তবায়িত হয়নি।
“… ইতিমধ্যেই আমি সরকারের উপদেষ্টাদের সামনে পাহাড়ের ঘটনার তদন্তে স্বাধীন, নিরপেক্ষ, যথাযথভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ক্ষমতায়িত কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছি। সেই তদন্ত কমিশনে অন্তত ৫০ শতাংশ নারী থাকা উচিত। সেখানে মানবাধিকারকর্মী, নারী অধিকারকর্মী, নৃবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী এবং অবশ্যই আইন ও বিচার বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তি থাকা উচিত। সরকার চাইছে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সংঘটিত নানা সহিংসতার তদন্ত জাতিসংঘের মাধ্যমে করতে। পাহাড়ে এত দিন ধরে বেশির ভাগ সহিংসতার বিচার হয়নি। জাতীয়ভাবে কমিশনের তদন্ত ছাড়াও জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধি দ্বারাও তদন্ত করা উচিত।


