বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য উত্তেজনা, শুল্কনীতি এবং ভঙ্গুর আর্থিক পরিবেশের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী হচ্ছে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। তবে এই টালমাটাল পরিস্থিতি সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী বড় ধরনের মন্দার আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা শুল্কনীতি এবং চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাল্টা পদক্ষেপ বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এতে অর্থনৈতিক কাঠামো যেমন চাপে পড়েছে, তেমনি আর্থিক বাজারেও বেড়েছে অস্থিরতা। ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা হ্রাস পাচ্ছে এবং ভোক্তাদের ব্যয়ও প্রভাবিত হচ্ছে।
জর্জিয়েভা বলেন, “এ অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার ফলে খরচ বাড়বে, আমাদের নতুন প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস উল্লেখযোগ্যভাবে নিম্নমুখী হবে। তবে এখনো বৈশ্বিক অর্থনীতির মৌল কাঠামো বেশ মজবুত রয়েছে, বিশেষত শ্রমবাজারের শক্ত ভিত্তি এবং আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার কারণে।” আইএমএফ জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপ এবং এর ফলে উদ্ভূত বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে দরপতন ঘটেছে। একইসঙ্গে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক আস্থায়ও ভাঙন ধরেছে। এসব বিষয়ে আলোচনা করতেই আগামী সপ্তাহে নিউইয়র্কে বসছে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ বসন্তকালীন সভা। এ সভায় অংশ নেবেন বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধান ও অর্থমন্ত্রীবৃন্দ।
এছাড়া মার্কিন ট্রেজারি ইল্ড কার্ভের সাম্প্রতিক আচরণকেও এক প্রকার “সতর্ক সংকেত” হিসেবে দেখছেন আইএমএফ প্রধান। এটি ভবিষ্যৎ মন্দার ইঙ্গিত হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা। বিশ্লেষকেরা বলছেন, মার্কিন শুল্কনীতি চলতি ও আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। আগামী বছরে যুক্তরাষ্ট্রে মন্দার সম্ভাবনা ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা ২০২৩ সালের পর সর্বোচ্চ মাত্রা। ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা মনে করেন, বাণিজ্যনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল। শুল্ক একদিকে পণ্যের মূল্য বাড়াতে পারে, অপরদিকে ভোক্তাদের ব্যয় কমিয়ে অর্থনীতির গতি কমিয়ে দিতে পারে। যদিও সামগ্রিকভাবে আইএমএফ বড় ধরনের মুদ্রাস্ফীতির পূর্বাভাস দিচ্ছে না, তথাপি সংশোধিত পূর্বাভাসে কিছু দেশে মুদ্রাস্ফীতির উর্ধ্বগতি দেখা যেতে পারে।
উল্লেখ্য জানুয়ারিতে আইএমএফ বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির যে পূর্বাভাস দিয়েছিল, তাতে ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের জন্য প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে নতুন বাস্তবতায় এই পূর্বাভাস সংশোধন করা হয়েছে। শিগগিরই ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’-এর হালনাগাদ সংস্করণ প্রকাশ করবে আইএমএফ। বিশ্বের বাণিজ্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জর্জিয়েভা বলেন, “অতীতে দেখা গেছে, যখন শুল্ক বাড়ানো হয়, তখন তার বোঝা বহন করে আমদানিকারক ও ভোক্তা—তারা হয় মুনাফা কমায়, নয়তো বেশি দাম দেয়। এ পরিস্থিতি বড় অর্থনীতিগুলোয় নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করলেও তা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে, বিশেষ করে ছোট দেশগুলোর জন্য।”
তার মতে সুরক্ষাবাদী নীতি উৎপাদনশীলতা হ্রাস করে, বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোয়। কারণ এ নীতি প্রতিযোগিতা, উদ্ভাবন এবং উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করে। তাই আইএমএফ দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে—অর্থনৈতিক সংস্কার চালিয়ে যেতে হবে, স্থিতিশীল ও বিশ্বাসযোগ্য মুদ্রানীতি বজায় রাখতে হবে এবং শক্তিশালী আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে জর্জিয়েভা বলেন, “আজকের দিনে বিশ্বের ক্ষমতা বিভিন্ন দেশের মধ্যে ভাগ হয়ে যাচ্ছে—একটি বহুমেরু বিশ্ব গড়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।”
তিনি বড় অর্থনীতির দেশগুলোকে আহ্বান জানান, তারা যেন শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমায় এবং একটি উন্মুক্ত ও নিয়মভিত্তিক বাণিজ্যব্যবস্থা গড়ে তোলে। কারণ বিশ্বের ছোট দেশগুলো এ অনিশ্চয়তা ও বাজারের অস্থিরতার সবচেয়ে বড় শিকার হয়।
এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি ন্যায্যতা ও নিয়মমাফিক সমঝোতায় পৌঁছায়, তবে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য একটি স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া অন্যান্য দেশগুলোকেও যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেয়ার আগে সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানান তিনি। প্রতিবেদনের শেষ অংশে জর্জিয়েভা বলেন, “সব দেশ, বড় হোক বা ছোট, এই অনিশ্চিত সময়ের চাপ মোকাবেলায় দায়িত্ব নিতে পারে এবং নেয়া উচিত। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যা স্থিতিশীল, সহনশীল এবং সহযোগিতাপূর্ণ, বিভক্ত নয়।”
এই বিবৃতি একদিকে যেমন সতর্কতা বহন করে, তেমনি অন্যদিকে দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য, সহযোগিতা ও সুবিবেচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়। বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রতিটি আন্দোলন-প্রতিক্রিয়ায় আজ সংযুক্ত বিশ্বের প্রতিটি মানুষের জীবিকা ও ভবিষ্যৎ নির্ভর করে—এই বার্তাই যেন উঠে আসে আইএমএফের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে।


