“…জুলাই-আগস্ট ২০২৪ ছাত্র-জনতার অভ্যুথান যে সরকারের জন্ম দিয়েছে সে সরকারের অর্থনৈতিক কৃতিত্বের সমালোচনা করার সময় এখনো আসেনি, কারণ সরকারের বয়স মাত্র সাত মাস। তবে গত মাসগুলোয় এ সরকারের আমলে ইতিবাচক এবং আশা জাগানিয়া কাজের মধ্যে আছে ব্যাংকগুলোর রক্তক্ষরণ বন্ধে ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ, বৈদেশিক মুদ্রার বাজার এবং রিজার্ভস্থিতিশীল রাখা, সংস্কার সাধনে বেশ ক’টা সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন তৈরি, পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ, চার মাসের আমদানি রিজার্ভ, স্থিতিশীল বিনিময় হার, লেনদেনের ভারসাম্য ইত্যাদি। সন্দেহ নেই যে ছয় মাসে অর্জিত এ ইতিবাচক পদক্ষেপ এরই মধ্যে প্রশংসা কুড়িয়েছে।
এর বিপরীতে সমালোচনার ঝুড়িতে আছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার ব্যর্থতা (যদিও ১ শতাংশ কমেছে বলে দাবি করা হচ্ছে), উচ্চ সুদের হারে ব্যাংক ঋণের জন্য স্থবির ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ফেরে বিনিয়োগ প্রায় শূন্যের কোটায় এবং অর্থনৈতিক মন্দার হুমকি মোকাবেলায় কার্যকর সরকারি পদক্ষেপের অনুপস্থিতি। সমালোচকদের চোখে আইএমএফের নির্দেশে নীতিমালা গ্রহণে গলায় আঙুল দেয়া, চাঁদাবাজি, দখলদারি, আমলানির্ভরতা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও টেন্ডার দখলদারত্ব বিগত সরকারের আমলের অনুসরণ।এতগুলো ইতিবাচক অর্জনের পরও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা ক্রমেই বাড়ছে এবং তা বড় বেগে বইছে, চায়ের কাপে তুলছে ঝড়।কারণগুলো নিম্নরূপ: প্রথমত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি অর্থনীতির চাকা রুদ্ধ করছে বলে প্রতীয়মান হয়।
…দ্বিতীয়ত, নির্বাচনী অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগ ব্যাহত হচ্ছে। কারণ বিনিয়োগকারী জানে না এ সরকারের গৃহীত নীতিমালা কত দিন টিকবে কিংবা এ সরকার কতদিন ক্ষমতায় থাকবেন আরো ছয় মাস, এক বছর না কয়েক বছর। …তৃতীয়ত, সত্য কিংবা মিথ্যা, জনমনে একটা ধারণা এই যে বর্তমান সরকার খুব দুর্বল একটা সরকার যার কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা নেই অথবা ‘সরকারের ভেতর সরকার’-এর কারণে এক পা এগোলে দুপা পিছায়। এমন অবস্থায় অর্থনীতির চাকা প্রত্যাশিত মাত্রায় সচল হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।স্বয়ং উপদেষ্টাদের কেউ কেউ মনে করছেন সরকার বদল হওয়ার পর চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব উবে যায়নি, মালিকানা বদলেছে মাত্র। অংক কষে দেখাচ্ছেন ৫ হাজার টাকার পরিবহন খরচ কীভাবে ১৫ হাজার টাকায় ওঠে। অথচ আমরা এর বিরুদ্ধে আইনের প্রয়োগ দেখতে পারছি না।
…অনিশ্চয়তা হচ্ছে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শত্রু। বর্তমান অনিশ্চয়তা দূর করতে হলে অন্তর্বর্তী সরকারকে আরো সরব হতে হবে, নীরব থাকলে চলবে না। মনে রাখতে হবে যে বাহানায়ই অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়ে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হোক না, তার দায়ভার পুরোটাই সরকারের ওপর বর্তায়। সুতরাং আমরা আশা করব আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সরকার কোনোভাবে চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে নির্মোহ, কঠিন ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং তা করতে গিয়ে অবশ্যই রাজনীতিকে সঠিক রাস্তায় আনা দরকার। কারণ রাজনীতি হচ্ছে অর্থনীতির প্রভু। বাংলাদেশের অর্থনীতির বেহাল দশা মেধাবী অর্থনীতিবিদের অভাবে নয়, বেহাল দশা স্বচ্ছ রাজনীতির অভাবে।
‘নতুন বিনিয়োগের চিন্তা করছেন না উদ্যোক্তরা’ এ শিরোনামে একটা খবর ছাপিয়েছে বণিক বার্তা (গত ৯ ফেব্রুয়ারি) যেখানে দেশের বিশিষ্ট শিল্পপতিদের মতামত তুলে ধরা হয়েছে।… এরা আমাদের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন এবং তাদের মতামত জানা জরুরি।ব্যবসায়ীদের যেমন মাথায় তোলার দরকার নেই, তেমনি পায়ে ঠেলে দিলে অর্থনীতির জন্য সমূহ বিপদ। একটা সর্বজনগ্রহণযোগ্য অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে দ্রুত একটা নির্বাচন অস্থিতিশীল পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে সক্ষম হতে পারে। “


