বিশেষজ্ঞ ও মূলধারার গণমাধ্যমে এই হঠাৎ বন্যার প্রাকৃতিক কারণ উঠে এলেও সামাজিক প্রচারমাধ্যমে প্রচুর মানুষ ভারতকে দায়ী করে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তাঁদের ধারণা-ভারত ডম্বুর বাঁধ খুলে দেয়ায় ফেনীতে প্রলয়ংকরী বন্যা হয়েছে। যদিও ডম্বুর বাঁধটি গোমতী নদীর ওপর, এর সাথে ফেনীর নদীগুলোর সংযোগ নেই।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ মন্তব্য করেছেন–ভারত বাঁধ খুলে দিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে সংকটের মধ্যে ফেলেছে। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্র সংস্কারের সময় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারত আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হচ্ছে।
উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ফেসবুকে এই বন্যাকে পরিকল্পিত দুর্যোগ’ বলেছেন এবং ‘নোটিশ ছাড়া ওয়াটার গেট খুলে দিয়ে বন্যার সৃষ্টি করা’-র জন্য ভারতকে দায়ী করেছেন।
বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ-মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে ও ভারতের সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলোতে অতিবৃষ্টির ফলে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢলে হঠাৎ বন্যা দেখা দিয়েছে।
পাহাড়ি ঢলে আকস্মিকভাবে ফেনী, কুমিল্লা, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও চট্টগ্রাম জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের ৮টি জেলার প্রায় ৩০ লাখ মানুষ আক্রান্ত। এই বন্যা স্বল্পমেয়াদী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
বহু বছরের মধ্যে সর্বাধিক বৃষ্টিপাতে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে ভয়াবহ বন্যায় অন্তত ১০ জন মারা গেছে। সেখানকার ডম্বুর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে পানি বিপদসীমা অতিক্রম করায় বাঁধ রক্ষায় জলাধার-এর গেট আংশিক খুলে পানি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে গোমতী নদীতে পানি বেড়ে ত্রিপুরা ও কুমিল্লায় বন্যার আরো অবনতি হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে।
এই ভারতবিরোধী জনমতের পেছনে সাম্প্রতিক ও দীর্ঘমেয়াদী প্রেক্ষাপট আছে। ভারত বহুবছর ধরে ফারাক্কা, গজলডোবা ইত্যাদি বাঁধ-ব্যারেজ দিয়ে শুকনো মৌসুমে আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানি প্রত্যাহার করে সুবিধামত ব্যবহার ও বাংলাদেশকে বঞ্চিত করে আসছে। বর্ষা মৌসুমে আবার নদীর অতিরিক্ত পানি বাংলাদেশকে না জানিয়ে ছেড়ে দেয়ার ফলে বন্যা হচ্ছে বলে অনেকের অভিযোগ।
শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বাংলাদেশ থেকে নিরাপত্তা, কানেকটিভিটি, বাণিজ্যসহ নানা সুবিধা পেলেও পানির ন্যায্য বন্টন ঝুলিয়ে রেখেছে। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক শাসনকে সমর্থন দিয়ে গেছে ভারত সরকার। সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের পর তাকে ভারতে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে সাহায্য করা হচ্ছে বলে জনমনে ধারণা। এসব কিছু মিলে ভারতবিরোধী ক্ষোভের তীব্র বহিঃপ্রকাশ ঘটছে এবারের বন্যাকে কেন্দ্র করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন-
প্রকৃতিবিনাশী কর্মকাণ্ড, অপরিকল্পিত বাঁধ, নদীর নাব্যতা সংকট, খাল হারিয়ে যাওয়ায় নদী-খাল যে পরিমাণ পানি বহন করতে পারত, সে ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। ফলে ভারি বৃষ্টি হলেই বন্যার কবলে পড়ছে মানুষ।
কারো কারো মত, এই অতিবৃষ্টিজনিত বন্যার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন ও উষ্ণায়নের সম্পর্ক রয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের একটি প্রধানতম ফল হলো সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার তারতম্য।
এ বছর মে মাসের দিকে বাংলাদেশে তাপদাহ এবং এ সময়ে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি ফলও বটে।


