একটি বই, যার পাতা পাতা ভরা অজানা অক্ষর আর চিত্র, কিন্তু একটিও মানুষ সেই ভাষার অর্থ বুঝতে পারেনি। এমনই এক রহস্যময় গ্রন্থের নাম The Voynich Manuscript। এই গ্রন্থটির মধ্যে লুকানো হয়েছে এমন এক ভাষা বা কোড যা আজও বিজ্ঞানী, ভাষাবিদ, এবং গুপ্তলিপি বিশারদদের মাথা ব্যথা হয়ে আছে। কে লিখেছিল এই অজানা ভাষায়? কেন? কার উদ্দেশ্যে? এবং কি লুকিয়ে আছে এতে? এসব প্রশ্ন আজও রহস্য।
১৯১২ সালে লিওনেল ভয়নিক নামের একজন বিরল গ্রন্থ সংগ্রাহক ইউরোপের একটি পুরনো বইয়ে নজর দিলেন। বইটির পাতা ছিল মোটা, পুরোনো চামড়ায় বাঁধা, আর প্রতিটি পাতায় ছিল অদ্ভুত অক্ষর আর অদ্ভুতসব রঙিন চিত্র। বইটির তারিখ প্রায় ১৫০০ সালের মধ্যভাগের হলেও ভাষা ছিল একেবারেই অজানা, যা কাউকে পড়তে দেয়নি। প্রথম দেখাতেই মনে হয় এটি কোনো গোপন সংকেত, বা এমন এক কোড যা যুগ যুগ ধরে কেউ ভাঙতে পারেনি।
এই গ্রন্থে রয়েছে রহস্যময় উদ্ভিদচিত্র, জ্যোতির্বিজ্ঞানের রেখাচিত্র এবং অনেকে বলেছে, এতে আছে গোপন জ্ঞান বা এমন কোনো দার্শনিক গূঢ় তথ্য যা মানবজগতের অজানা দ্বার খুলে দিতে পারে। তবে ভাষাটি ছিল সম্পূর্ণ অনির্বচনীয়। কখনো কেউ নিশ্চিত হতে পারেনি এটি কি আসল ভাষা, না কি ভুয়া কোনো সংকেত বা র্যান্ডম অক্ষর?
কে লিখেছিল? এবং কেন?
বইটির জনকের নাম আজ পর্যন্ত অজানা। কেউ মনে করেন এটি ছিল কোনো মধ্যযুগীয় বিজ্ঞানীর গোপন গবেষণালিপি, আবার কেউ মনে করেন কোনো গুপ্তমিশন বা গুপ্তধনের মানচিত্র। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এমন ভাষায় কেউ কীভাবে এত সুচারুভাবে লিখতে পারল, যা একেবারে অচেনা হলেও নিয়ম মেনে চলে?
কিছু ভাষাবিদ এই বইটিকে ‘কৃত্রিম ভাষা’ বা “constructed language” হিসেবে মনে করেন। অর্থাৎ এটি কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে, কেবল নির্বাচিত বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীর জন্য নির্মিত ভাষা। কেউ আবার মনে করেন, এটি কোনো ছদ্মবেশী ভাষা, যা প্রকৃত সত্য বা গোপন তথ্য লুকানোর জন্য তৈরি হয়েছে।
The Voynich Manuscript একমাত্র নয়। ইতিহাসে এমন অসংখ্য নিখোঁজ ভাষা ও কোড রয়ে গেছে, যেগুলো আজো মানুষের বোধগম্যের বাইরে। Linear A মৃগয়া সভ্যতার এক লিপি, যা ক্রেতা ধ্বংসাবশেষ থেকে পাওয়া গেছে। এর ভাষা এখনো পড়া যায়নি। Rongorongo ইস্টার দ্বীপের একটি অক্ষর ব্যবস্থা, যার অর্থ পাঠোদ্ধার করা হয়নি। Indus Script হাজার হাজার বছরের পুরানো একটি সংকেতভাষা এটিও এখনও গূঢ়। এসব ভাষা বা কোড সাধারণ ভাষার মতো নয়; এগুলোতে লুকানো থাকতে পারে কোনো রহস্য, ধর্মীয় বিশ্বাস, অথবা সাম্রাজ্যের গোপন পরিকল্পনা।
কেন আমরা আজও পড়তে পারছি না?
বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পরও কেন এই ভাষাগুলো রহস্যময়? এর কারণ অনেক, পর্যাপ্ত তুলনামূলক ডেটার অভাব, পাঠোদ্ধার করতে হলে ভাষার তুলনীয় ডেটা থাকা জরুরি। কিন্তু এই নিখোঁজ ভাষাগুলোর জন্য এমন কোনো ‘দ্বিভাষিক গ্রন্থ’ বা রেফারেন্স মেলেনি। হয়তো এগুলো কখনোই প্রকৃত ভাষা ছিল না, বরং কেবল কোনো এক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী গোপন বার্তা লুকানোর জন্য বানিয়েছিলো। সময়ের সাথে অনেক তথ্য ধ্বংস হয়ে গেছে, বইটির কোনো ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট কিংবা মূল লেখকের পরিচয় নেই।
অ্যানালিটিক্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) যুগে, এই গ্রন্থটির বিশ্লেষণে নতুন নতুন অ্যালগরিদম ব্যবহার হচ্ছে। মাঝে মাঝে কেউ দাবি করেন ভাষার অর্থ বোঝা গেছে, আবার কেউ সেটা অস্বীকার করেন। এখনো পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো তথ্য হাতে আসেনি।
তবে এটাই নিশ্চিত যে The Voynich Manuscript আমাদের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ধাঁধা। মানুষ কখনো কখনো এমন জ্ঞান তৈরি করে যা সে নিজে বাদে আর কেউ বুঝতে পারে না, এইখানে সে পুরোপুরি স্বাধীন।


