নিউ ইয়র্কের এক শীতল বিকেল। জানালার ওপারে বৃষ্টি পড়ছে, রাস্তার মোড়ে লাল ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে আছে এক নারী। কাচের ওপারে জমে থাকা বৃষ্টির ফোঁটায় তার মুখ অস্পষ্ট, ছায়াচ্ছন্ন। ছবির পুরো ফ্রেমজুড়ে নরম আলো, ধোঁয়াটে রঙ, নিঃসঙ্গতা এবং অদ্ভুত রকমের স্থিরতা। এটাই স্যাউল লাইটারের সবচেয়ে বিখ্যাত ছবিগুলোর একটি “Red Umbrella” (1958)।
স্যাউল লাইটার (Saul Leiter, ১৯২৩–২০১৩) ছিলেন এমন এক শিল্পী, যিনি ফটোগ্রাফিকে কখনও সাংবাদিকতা বা নাটকীয়তার মাধ্যম হিসেবে দেখেননি। বরং তিনি এটিকে দেখেছিলেন যেন একধরনের মৌন চিত্রকাব্য। তার ছবিতে কাহিনি নেই আছে অনুভব, বর্ণনার বদলে আভাস, স্পষ্টতার বদলে অনিশ্চয়তা। আর এ কারণেই তিনি ফটোগ্রাফির ইতিহাসে অনন্য।
১৯৫০-এর দশকে, ফটোগ্রাফির জগতে রঙিন ছবি তখনও সিরিয়াস আর্ট হিসেবে গ্রহণযোগ্য ছিল না। পত্রিকার বিজ্ঞাপন ও পারিবারিক অ্যালবামের জায়গায় রঙিন ছবি সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু স্যাউল লাইটার এই তথাকথিত শুদ্ধতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে ভেঙে দিয়ে রঙকেই নিজের ভাষা করে নিলেন। তবে তার রঙ চড়া বা রোমাঞ্চকর নয় বরং ধোঁয়াটে, কুয়াশাভেজা, অনুভূতির মতো নরম। Kodachrome ফিল্মে তোলা তার ছবিগুলো যেন পেইন্টিংয়ের মতো, যেখান থেকে আলো ও ছায়ার নীরব মিশ্রণ ভেসে আসে।
তিনি বলতেন, “In order to build a career and to be successful, one has to be ambitious. Well, I guess I’m not ambitious.” এই কথাটি যেন তার শিল্পীসত্তার নির্যাস। তিনি কখনোই নাম-যশ-প্রতিযোগিতায় ছিলেন না। বরং নিজেকে গুটিয়ে রেখে, শহরের আনাচে-কানাচে, জানালার আড়াল থেকে তিনি তুলে আনতেন জীবনের নিঃশব্দ কবিতা।
স্যাউল লাইটার মূলত স্ট্রিট ফটোগ্রাফার, কিন্তু তার চোখ রাস্তার কোলাহলে নয়, নীরবতায়। অনেক সময় তিনি ছবি তুলেছেন জানালার ভিতর থেকে, যার কাচে জমে আছে বৃষ্টির ফোঁটা, কুয়াশা কিংবা প্রতিফলন। সে জানালার ওপারে মানুষ হেঁটে যাচ্ছে, বাস দাঁড়িয়ে আছে, আলো জ্বলছে;, কিন্তু সবকিছুই যেন এক পর্দার আড়াল থেকে দেখা, একধরনের স্বপ্নের ভিতর থাকা।
তার ছবিতে প্রায়ই দেখা যায় ছায়া, ছেঁড়া আংশিক মুখ, দূরের অবয়ব। বিষয়বস্তুর স্পষ্টতা যেন ইচ্ছা করেই গায়েব। ফলে ছবিটি হয়ে ওঠে এক অন্তর উপলব্ধি যেখানে মানুষ শুধু মানুষ নয়, বরং তার অভ্যন্তরীণ নিঃসঙ্গতাও।
একটি চমৎকার উদাহরণ হলো তার “Phone Call” (1957) নামক ছবিটি। ছবিটিতে দেখা যায়, একজন নারী টেলিফোন বুথে কথা বলছেন, কিন্তু বুথের কাচ ও আলোর প্রতিফলনে তার মুখ আংশিক আবৃত। আমরা জানি না সে কাকে বলছে, কী বলছে, শুধু অনুমান করি।ছবির চুপচাপ দৃষ্টিভঙ্গি সেই অপরিচিত মেয়েটিকে যেন আমাদের চেনা চেনা করে তোলে।
আরেকটি ছবির কথা বলা যায় “Snow” (1960)। এই ছবিতে ঝরতে থাকা তুষার, কাচে জমে থাকা জলকণা আর ট্রাফিক লাইটের আবছা প্রতিচ্ছবি সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক রহস্যময় শীতলতা।
“Soames Bantry” নামক একটি পোর্ট্রেট ছবিতে লাইটার তার প্রেমিকা ও চিত্রশিল্পী সঙ্গীকে দেখিয়েছেন এক গভীর স্নিগ্ধতায়।এই ছবির আলোর ব্যবহার, চোখের দৃষ্টি, ও রঙের স্তর যেন প্রেম ও ব্যক্তিগত ইতিহাসকে এক ফ্রেমে বেঁধে দেয়।
স্যাউল লাইটার মূলত চিত্রশিল্পী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তার পিতার ইচ্ছা ছিল তিনি রাব্বি হবেন, কিন্তু তিনি ধর্মীয় শিক্ষা ছেড়ে আর্ট স্কুলে ভর্তি হন। তার অনেক অঙ্কন ও পেইন্টিং পরবর্তীকালে প্রদর্শিত হয়েছে। চিত্রশিল্পের এই প্রভাব তার ফটোগ্রাফি কম্পোজিশনে স্পষ্ট। তিনি ফ্রেমকে ভাগ করেন দেয়ালের রেখা, জানালার কাঁচ, ছায়া বা আলো দিয়ে। অনেক সময় ছবির বড় অংশ জুড়ে থাকে শুধু ধূসর দেয়াল বা কোনো বিমূর্ত রঙের স্তর এবং কোণে ছোট একটি মানব অবয়ব। এতে করে বাস্তবতা ঝাপসা হয়ে যায়, দর্শক বাধ্য হন ছবির মধ্যে নিজের গল্প খুঁজে নিতে।
এটিই লাইটারের ছবি দেখার প্রধান আহ্বান, এখানে আপনি শুধু একজন ফটোগ্রাফারের চোখে নয়, একজন কবির দৃষ্টিতে পৃথিবী দেখেন।লাইটারের ছবিতে সবচেয়ে শক্তিশালী যে উপাদানটি থাকে তা হলো নীরবতা। কোনো চিৎকার নেই, নাটকীয় মুহূর্ত নেই। একজন মানুষ ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে আছে এইটুকুই। কিন্তু সে দাঁড়ানো যেন এক গভীর গল্প বলছে।
“Man with Straw Hat” ছবিটিতে আমরা দেখি ট্রামের কাচের পেছনে একজন পুরুষ, মুখ পুরো ঢাকা। ছবিতে সেই কাচ, সেই রঙ, সেই গাঢ় আলো ও ছায়া সব মিলিয়ে যেন আমরা কিছু দেখি না, বরং কিছু অনুভব করি।
আরো কিছু কাজের কথা না বললেই নয়—“Taxi”, “Walking”, “Through Glass”, “Foot on El” প্রভৃতি ছবিতে শহরের প্রতিদিনকার জীবনকে নতুন দৃষ্টিতে ধরা হয়েছে, যেভাবে অন্য কেউ দেখেননি।
তার ছবিগুলো এক ধরনের উপস্থিত অনুপস্থিতি সৃষ্টি করে যেখানে মানুষ আছে, আবার নেইও। তারা বাস্তব নয়, স্মৃতি। যেন আমাদের জীবনেই তারা কোথাও ছিল, হারিয়ে গেছে, আবার ফিরে এসেছে কোনো প্রতিফলনে।
স্যাউল লাইটারের অনেক ছবি ৫০ বছর পর প্রকাশিত হয়েছে। ২০০৬ সালে Steidl থেকে প্রকাশিত “Early Color” বইটি তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপর আসে বহু প্রদর্শনী, ডকুমেন্টারি ফিল্ম (In No Great Hurry) এবং তরুণ ফটোগ্রাফারদের এক নতুন অনুপ্রেরণা।
তিনি নিজে কোনোদিন গ্যালারি বা পুরস্কারের পেছনে ছোটেননি। তিনি যেন নিজের ছবিগুলোকেও তার মতই লুকিয়ে রাখতেন। স্যাউল লাইটারের ফটোগ্রাফি আমাদের বলে, শহরের গল্প শুধু শব্দে নয়, তা বলা যায় আলো-ছায়ার ফাঁক গলে। তার ছবি এক ধরনের দার্শনিক পটভূমি তৈরি করে, যেখানে দৃশ্য নয়, অনুভব মুখ্য। আপনি যা দেখছেন তা সম্পূর্ণ নয় কিন্তু তাতেই জীবনের পূর্ণতা।


