শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার দেশব্যাপী আন্দোলনের পর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক ক্রমশ শীতল হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, ব্যাংককে বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুসের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক উত্তেজনা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল উপস্থিত ছিলেন। ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। মোদি জোর দিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি এবং বাংলাদেশ সরকারকে এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভারত গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশকে সমর্থন করে।’
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে দেশটি ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মুহাম্মদ ইউনুস বলেন, ‘বাংলাদেশ ভারতকে অত্যন্ত মূল্য দেয় এবং দুই দেশের বন্ধুত্ব পারস্পরিক ইতিহাস, ভৌগোলিক অবস্থান ও সাংস্কৃতিক সখ্যতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের সমর্থন এখনো আমরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি।’ সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয়টিও বৈঠকে উত্থাপিত হয়। দুই দেশই দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত চোরাচালান ও অবৈধ অভিবাসন নিয়ে উদ্বিগ্ন, যা দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।
সম্প্রতি মুহাম্মদ ইউনুস চীনে এক সফরের সময় উত্তর-পূর্ব ভারত নিয়ে মন্তব্য করেন, যা দুই দেশের মধ্যে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, ‘ভারতের সাতটি রাজ্য, যা ‘সেভেন সিস্টারস’ নামে পরিচিত, স্থলবেষ্টিত এবং তাদের সমুদ্রের সঙ্গে কোনো সংযোগ নেই। বাংলাদেশ তাদের সমুদ্রের অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে পারে, যা চীনের অর্থনীতির জন্য সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করতে পারে।’ বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা হয়। মুহাম্মদ ইউনুস বিমসটেক সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির জন্য ভারতের সমর্থন চান। পাশাপাশি, তিনি গঙ্গার পানি চুক্তি নবায়ন ও তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি চূড়ান্ত করার জন্য আলোচনার আহ্বান জানান।
বৈঠকে মুহাম্মদ ইউনুস শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি উত্থাপন করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ‘শেখ হাসিনা ভারত থেকে মিডিয়ার সামনে উসকানিমূলক মন্তব্য করে বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছেন।’ তিনি ভারতের কাছে আহ্বান জানান, ‘আপনার দেশে অবস্থানকালে তাকে এই ধরনের মন্তব্য করা থেকে বিরত রাখার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।’ মোদির সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের জবাবে মুহাম্মদ ইউনুস দাবি করেন যে ‘সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বেশিরভাগ প্রতিবেদন অতিরঞ্জিত ও ‘ফেক নিউজ’।’ তিনি বলেন, ‘দেশে ধর্মীয় ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার প্রতিটি ঘটনা পর্যবেক্ষণের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে এবং সর্বত্র এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা নিরসনে উভয় পক্ষের কৌশলগত কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সংলাপ, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ওপর।


