কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) চ্যাটবট চ্যাটজিপিটি বর্তমানে প্রযুক্তি জগতে আলোচিত একটি নাম। এর উত্তর দেওয়ার দক্ষতা, প্রাসঙ্গিকতা ও গোছানো ভাষা অনেককেই বিস্মিত করে। তবে এই চ্যাটবটের পেছনের প্রযুক্তি ও বিশাল প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে অনেকেরই ধারণা নেই। শুধু ব্যবহার করলেই যথেষ্ট নয় বরং এর কাজের ধরন ও সীমাবদ্ধতাও জানা জরুরি।
চ্যাটজিপিটি একধরনের লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (Large Language Model – LLM)। আরও নির্দিষ্টভাবে এটি একটি ক্যাজুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল, যার মূল কাজ হলো পূর্ববর্তী শব্দগুলোর ভিত্তিতে পরবর্তী শব্দ কী হতে পারে, তা অনুমান করে লেখা তৈরি করা। এটি অনেকটা স্মার্টফোনের ভবিষ্যদ্বাণীমূলক লেখার মতো, তবে অনেক বেশি উন্নত ও জটিল।
আপনি যখন কোনো প্রশ্ন করেন চ্যাটজিপিটি প্রথমে সেই লেখাকে টোকেনে ভেঙে ফেলে। টোকেন হচ্ছে টেক্সটের ক্ষুদ্র একক, একটি শব্দ বা শব্দাংশ।যেমন, ‘চ্যাটজিপিটি’ শব্দটি ‘চ্যাট’ ও ‘জিপিটি’—এই দুটি টোকেনে বিভক্ত হতে পারে। এরপর চ্যাটজিপিটি এই টোকেনগুলো বিশ্লেষণ করে আপনার প্রশ্নের প্রাসঙ্গিকতা বোঝে এবং সম্ভাব্য পরবর্তী টোকেন কোনটি হতে পারে, তা গণনা করতে থাকে। এভাবে একটির পর একটি টোকেন যোগ করে সম্পূর্ণ উত্তর তৈরি হয়, যা আপনি দেখতে পান টাইপিংয়ের মতো।
চ্যাটজিপিটির মূল শক্তি ট্রান্সফরমার নামক গভীর শিক্ষণভিত্তিক (ডিপ লার্নিং) মডেল এবং এর সেল্ফ-অ্যাটেনশন প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে চ্যাটজিপিটি বুঝতে পারে, একটি বাক্যের কোন শব্দ কোনোটার সঙ্গে কতটা সম্পর্কিত। যেমন, ‘The bank will not approve the loan.’ বাক্যে ‘bank’ শব্দটি নদীর পাড় নাকি আর্থিক প্রতিষ্ঠান—তা বাক্যের অন্যান্য শব্দ দেখে চ্যাটজিপিটি নির্ধারণ করতে পারে। এই প্রযুক্তির জন্যই এটি বাক্য বা অনুচ্ছেদের প্রেক্ষাপটে শব্দের অর্থ বুঝে নিতে পারে।
চ্যাটজিপিটি বিশাল পরিমাণ তথ্য পড়ে ও বিশ্লেষণ করে প্রশিক্ষিত হয়েছে। প্রশিক্ষণ দুটি ধাপে চলে—প্রি-ট্রেইনিং ও ফাইন-টিউনিং। প্রথম ধাপে এটি বিপুল পরিমাণ লেখাজোখা বিশ্লেষণ করে কোন শব্দের পরে কোন শব্দ সাধারণত আসে তা শেখে। ফাইন-টিউনিং ধাপে, নির্দিষ্ট কিছু ডেটা ও মানুষের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মডেলটির আচরণ আরও উন্নত ও নিরাপদ করা হয়।
চ্যাটজিপিটি প্রতিবার উত্তর তৈরির সময় সম্ভাব্য অনেক টোকেনের মধ্যে সবচেয়ে উপযুক্তটি বেছে নেয়। তবে কখনো কখনো কয়েকটি টোকেনের সম্ভাবনা কাছাকাছি হলে যেকোনো একটি বেছে নেওয়া হয়, ফলে একই প্রশ্নের ভিন্ন ভিন্ন যুক্তিসঙ্গত উত্তর পাওয়া যায়।
তবে চ্যাটজিপিটি আসলে একটি ভবিষ্যদ্বাণীমূলক লেখার মডেল, এর কোনো চেতনা বা সত্যিকার বোঝার ক্ষমতা নেই। এটি শুধু ডেটার মধ্যকার প্যাটার্ন দেখে পরবর্তী সম্ভাব্য শব্দ অনুমান করে চলে। তাই কখনো কখনো ভুল, অসংলগ্ন বা ভ্রান্ত তথ্য (হ্যালুসিনেশন) দিতে পারে। আবার প্রশিক্ষণ ডেটায় থাকা পক্ষপাতিত্ব বা ভুল দৃষ্টিভঙ্গিও অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রতিফলিত হতে পারে।
চ্যাটজিপিটি মানুষের মতো ভাষায় উত্তর দিলেও, এটি আসলে জটিল গাণিতিক ও ভাষাগত মডেলের ওপর নির্ভরশীল একটি এআই টুল। এর সীমাবদ্ধতা ও কাজের ধরন জানা থাকলে ব্যবহারকারীরা আরও সচেতনভাবে এবং কার্যকরভাবে এআই চ্যাটবটের সুবিধা নিতে পারবেন।


