বিগত কয়েক দশক ধরেই অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যখন অধিকাংশ অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ কার্যকারিতা হারাচ্ছে, তখন পুরনো চিকিৎসা পদ্ধতিগুলোর প্রতি বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিভঙ্গি নতুনভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। সম্প্রতি একটি ১০০০ বছর পুরনো অ্যাংলো-স্যাক্সন চিকিৎসা রেসিপি আলোচনায় এসেছে, যা ল্যাবরেটরিতে MRSA-এর মতো মারাত্মক ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে আধুনিক অ্যান্টিবায়োটিককে টপকে কার্যকারিতা দেখিয়েছে।
এই প্রাচীন ওষুধের নাম ‘Bald’s Eye Salve’। ইউনিভার্সিটি অব নটিংহ্যামের একটি গবেষণা দল এই রেসিপি পুনর্গঠন করে বিশ্লেষণ করেছে এবং তা থেকে প্রাপ্ত ফলাফল চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘Bald’s Leechbook’ নামে পরিচিত একটি ৯ম শতাব্দীর অ্যাংলো-স্যাক্সন চিকিৎসা-গ্রন্থে ‘Bald’s Eye Salve’ নামক একটি সংমিশ্রণ ওষুধের উল্লেখ পাওয়া যায়। এটি চোখের সংক্রমণের জন্য ব্যবহৃত হতো বলে জানা যায়। রেসিপিতে ব্যবহৃত উপাদানগুলো হলো রসুন (garlic), পেঁয়াজ বা লিক (onion/leek), পুরনো ওয়াইন, গরুর পাকস্থলীর নির্যাস (ox bile)।
এই উপাদানগুলো মিশিয়ে একটি তামার পাত্রে এক রাত রেখে ওষুধটি প্রস্তুত করার কথা বলা হয়েছে। গ্রন্থের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর ছিল। দীর্ঘকাল ধরে একে লোকবিশ্বাস কিংবা ঐতিহ্যগত চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, আধুনিক গবেষণার আলোকে এটির কার্যকারিতা আজ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত।
ইউনিভার্সিটি অব নটিংহ্যামের মাইক্রোবায়োলজিস্ট ড. ফ্রেয়া হ্যারিসন এবং তাঁর সহকর্মীরা এই প্রাচীন রেসিপি অনুসরণ করে ল্যাবরেটরিতে ওষুধটি তৈরি করেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল ব্যাকটেরিয়া-প্রতিরোধী সংক্রমণ, বিশেষ করে MRSA (Methicillin-resistant Staphylococcus aureus) এর ওপর এই ওষুধের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা।
প্রথমে তাঁরা রেসিপির প্রতিটি উপাদান আলাদাভাবে ব্যাকটেরিয়ার ওপর প্রয়োগ করেন, কিন্তু তেমন কোনো কার্যকর ফল পাননি। এরপর যখন সব উপাদান ঐতিহাসিক পদ্ধতিতে মিশিয়ে ওষুধ তৈরি করা হয়, তখন দেখা যায় এটি বায়োফিল্ম আকারে গঠিত কলোনির বিরুদ্ধে ৯০% পর্যন্ত MRSA ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সক্ষম।
ব্যাকটেরিয়ার একটি বিশেষ রূপ হলো বায়োফিল্ম, যেখানে তারা নিজেদের একটি সুরক্ষিত জেলি-আবরণে ঢেকে ফেলে। এই আবরণ ওষুধ প্রবেশে বাধা দেয় এবং চিকিৎসা ব্যর্থ হয়। হাসপাতালের সংক্রমণ, দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত, যন্ত্র প্রতিস্থাপন এসব ক্ষেত্রে বায়োফিল্ম ব্যাকটেরিয়া ভয়াবহ সমস্যা সৃষ্টি করে।
বর্তমানে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে বায়োফিল্ম ধ্বংস করা একটি জটিল কাজ। অথচ ‘Bald’s Eye Salve’ বায়োফিল্মের বিরুদ্ধেও কার্যকারিতা দেখিয়েছে।
এই রেসিপির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো একটি উপাদানও একা কার্যকর নয়। কেবল চারটি উপাদান একত্রে মিশ্রিত হলে তৈরি হয় এক ধরনের যৌগিক প্রতিক্রিয়া, যাকে বলে synergistic effect। এই প্রক্রিয়ায় একাধিক রাসায়নিক যৌগ পরস্পরের সাথে মিথস্ক্রিয়ায় নতুন অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল গঠন করে, কিন্তু আলাদাভাবে সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। গবেষকরা মনে করছেন ওয়াইনে থাকা অ্যালকোহল, রসুনের অ্যালিসিন, পেঁয়াজের সালফার যৌগ এবং গরুর পাচক রস একত্রে ব্যাকটেরিয়ার কোষপ্রাচীর ভেঙে ফেলার মতো যৌগ উৎপাদন করতে পারে।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ও নির্বিচার ব্যবহারের ফলে ব্যাকটেরিয়া নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলছে। ফলে বহু রোগের চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধজনিত কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতির কার্যকারিতা পুনঃমূল্যায়ন করা জরুরি হয়ে উঠেছে। ‘Bald’s Eye Salve’ তার এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
এই গবেষণাটি ইঙ্গিত দেয়, বহু প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতি কেবল কুসংস্কার ছিল না; বরং তাদের কার্যকারিতার পেছনে একটি বাস্তব, পরীক্ষিত জ্ঞানভিত্তি ছিল। গবেষণা যদি সুনির্দিষ্টভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে অতীতের বহু রেসিপি ও পদ্ধতি আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। বিশ্বজুড়ে বর্তমানে নানা প্রকৃতিনির্ভর ও লোকজ চিকিৎসা-পদ্ধতিকে বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করার উদ্যোগ চলছে। ‘Bald’s Eye Salve’-এর সাফল্য এসব গবেষণার সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে।
‘Bald’s Eye Salve’-এর কার্যকারিতা প্রমাণ করে প্রাচীন চিকিৎসা-পদ্ধতিগুলো অপ্রাসঙ্গিক নয় বরং তাদের কিছু অংশে অত্যন্ত কার্যকর সমাধান লুকিয়ে থাকতে পারে। বর্তমান বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকট, বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের প্রেক্ষাপটে, এই ধরনের গবেষণা মানবজাতির টিকে থাকার অন্যতম দিক হতে পারে।


