এক সময় বাংলাদেশের পরিবার মানেই ছিল এক ছাদের নিচে বহু মানুষের কোলাহল। যৌথ পরিবার ছিল সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু।গ্রীষ্মের দুপুরে ছাদে উঠে আচারের বয়াম চুরি করা, বিকেলে গলিতে ক্রিকেট খেলা, আর সন্ধ্যায় কর্তার পদধ্বনিতে হঠাৎ চুপসে যাওয়া, এই ছিল জীবনের রুটিন। পরিবারের কর্তা মানেই ছিলেন ভয়ের আরাধ্য প্রতিমূর্তি। তার সামনে কেউ খেলনা নিয়ে খেলতো না, হাসতো না, এমনকি উচ্চস্বরে কথা বলাও ছিল নিষেধ!
তবে সময় বদলেছে। এখনকার শহুরে পরিবারে সে রকম দৃশ্য খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বড় বড় ফ্ল্যাটে এখন চারজনের ছোট্ট পরিবার, নীরব নিস্তব্ধ ঘর আর প্রযুক্তিতে ডুবে থাকা সন্তানরা। পরিবার ছোট হয়েছে, সম্পর্কের রূপ বদলেছে, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় এই বদল আদৌ ভালো না খারাপ?
বাংলাদেশের পরিবার কাঠামো গত কয়েক দশকে এক অনবদ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একসময় যেখানে যৌথ পরিবার ছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের প্রাণকেন্দ্র, আজ সেখানে আধুনিক নগরায়ন, অর্থনৈতিক পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক সংস্কৃতির ছোঁয়া নতুন এক পরিবার কাঠামো গড়ে তুলেছে। এই রূপান্তর শুধুমাত্র গৃহের আকার বা সদস্যসংখ্যার পরিবর্তন নয়, এটি সামাজিক সম্পর্ক, অভিভাবকত্ব, মূল্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের নতুন সংজ্ঞা নিয়ে এসেছে।
ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশে ‘যৌথ পরিবার’ ছিলো মানুষের প্রথম সামাজিক সংস্থা। Durkheim-এর ‘মেকানিক্যাল সংহতি’ প্রতিফলিত হতো এই গোষ্ঠীগুলোর বন্ধনে যেখানে রক্ত ও ধর্মীয় ঐক্যের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে উঠতো। আজকের দিনে নগরায়ন ও আধুনিক জীবনের চাপে পরিবারে ‘অর্গানিক সংহতি’ কাজ করছে, যেখানে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও স্বাধীনতার ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপিত হয়।ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলোতে ছোট, নিউক্লিয়ার পরিবার আধিপত্য বিস্তার করছে। পরিবারে সদস্যসংখ্যা কমলেও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা বেড়েছে।
Talcott Parsons-এর ‘প্রাথমিক সামাজিকীকরণ’ ও ‘প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিত্বের স্থিতিশীলতা’র ধারণা অনুযায়ী, আধুনিক পরিবার সন্তানদের সামাজিকীকরণের মূল কেন্দ্র। বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের দ্রুত বৃদ্ধি, নারী শ্রমবাজারে প্রবেশ ও ভোগবাদী সংস্কৃতি পরিবারের কাঠামো ও ভূমিকা পাল্টে দিয়েছে। দুই অভিভাবকের আয় নির্ভর পরিবার অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হলেও তাদের সময় সংকট জন্মাচ্ছে, যা সন্তানের যত্ন ও মনোযোগে প্রভাব ফেলে। গৃহকর্মী ও ক্যার গিভারদের ওপর পরিবারের নির্ভরতা বেড়েছে, যা ‘কেয়ার ইকোনমি’ বিষয়ে নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিতর্ক উত্থাপন করছে।
Ulrich Beck-এর ‘ইন্ডিভিজুয়ালাইজেশন থিওরি’ অনুযায়ী, আধুনিক সমাজে ব্যক্তিরা পরিবার থেকে স্বাধীন হয়ে নিজের পরিচয় ও জীবনপথ নির্ধারণে অধিক গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশের তরুণরা এখন ‘লাভ ম্যারেজ’, ‘ডিভোর্স’ এবং পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলছে। মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগ ও প্রযুক্তি তাদের জীবনধারাকে বদলে দিয়েছে। টেলিভিশন, ইউটিউব, ফেসবুকের প্রভাব পরিবারের পারস্পরিক সংযোগকে নতুন আঙ্গিকে পরিবর্তন করেছে। ‘মিডিয়া পরিবার’ ও ‘ডিজিটাল সম্পর্ক’ এখন বাস্তবের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের যুগে পারিবারিক সম্পর্কের ধরন বদলেছে। শিশু ও কিশোররা প্রকৃতির পরিবর্তে ভার্চুয়াল জগতে অধিক সময় ব্যয় করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শহুরে কিশোরদের গড় স্ক্রিন টাইম দিনে ৫ থেকে ৭ ঘণ্টার মধ্যে। ফলে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া দ্রুত ডিজিটালাইজড হচ্ছে, কিন্তু এর সঙ্গে আবেগীয় বন্ধন দুর্বল হচ্ছে। এই বাস্তবতা পরিবারের আভ্যন্তরীণ সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারে মা-বাবা দুজনেই কর্মজীবী হওয়ার ফলে সন্তানদের প্রতি সময়ের অভাব ক্রমশ বেড়েছে। প্রবাসী পরিবারের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে ‘লেফট বিহাইন্ড ফ্যামিলি’ বা পরিত্যক্ত পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে, যেখানে অর্থ আসে কিন্তু আবেগীয় সঙ্গীনতা কমে যায়। গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসনের ফলে পারিবারিক বন্ধন এবং সামাজিক দায়িত্ব পালনের চ্যালেঞ্জ বাড়ছে।
বাংলাদেশি পরিবারের কাঠামো ও সম্পর্কের রূপান্তর একটি বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া। নগরায়ন, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের ছোঁয়ায় পরিবার শুধুমাত্র গৃহ নয় একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুনরায় সংজ্ঞায়িত হচ্ছে। Durkheim-এর মতবাদ অনুসারে, সম্পর্কের ধরন পরিবর্তিত হলেও মানুষের সামাজিক সংযোগের চাহিদা অক্ষুণ্ণ থাকে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পরিবার কীভাবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবে এবং সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করবে, সেটাই সমাজতত্ত্ব ও নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় প্রশ্ন।


