২০২২ সালের নভেম্বর মাসে রেকর্ড পঞ্চমবারের মতো ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী পদে পুনঃনির্বাচিত হন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি রক্ষণশীল লিকুদ পার্টির প্রধান এবং ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে ডানপন্থী জোট সরকারের এখন নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
বিবিসি বলছে, ৭৫ বছর বয়সী নেতানিয়াহু ছয়বার প্রধানমন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন, যা একটি অতুলনীয় সাফল্য এবং যা অনেকাংশে তার নিজস্ব ‘মি. সিকিউরিটি’ বা ‘নিরাপত্তার রক্ষক’ ভাবমূর্তির ফল।
নেতানিয়াহু আগেই বলেছিলেন, তিনি ইসরায়েলের রক্ষক হিসেবেই স্মরণীয় হতে চান। যদিও নেতানিয়াহুর শাসনামলেই ইসরায়েল তার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার শিকার হয়।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং এর পরবর্তী যুদ্ধ নেতানিয়াহুর বিচার ব্যবস্থা সংস্কারের বিরুদ্ধে সপ্তাহব্যাপী চলা গণআন্দোলনকেও থামিয়ে দেয়, যা দেশটিকে মাসের পর মাস বিভক্ত করে রেখেছিল। সমালোচকরা নেতানিয়াহুকে দেশের বিভাজনের জন্য এবং গণতন্ত্রের জন্য হুমকি বলেও অভিহিত করেন।
১৯৪৯ সালে তেলআবিবে জন্ম নেন নেতানিয়াহু। ১৯৬৩ সালে তার বাবা বেঞ্জিয়ন (ইতিহাসবিদ ও জায়নিস্ট কর্মী) একটি একাডেমিক পদের প্রস্তাব পেয়ে পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান।
১৮ বছর বয়সে নেতানিয়াহু ইসরায়েলে ফিরে যান এবং পাঁচ বছর সেনাবাহিনীতে কাটান, যেখানে তিনি একটি অভিজাত কমান্ডো ইউনিট ‘সায়েরেত মাতকাল’-এ ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালে ফিলিস্তিনিদের দ্বারা অপহৃত একটি বেলজিয়ান এয়ারলাইনারে অভিযানের সময় তিনি আহত হন এবং ১৯৭৩ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৭৬ সালে নেতানিয়াহুর ভাই জনাথন উগান্ডার এনতেবেতে অপহৃত একটি উড়োজাহাজের যাত্রীদের উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে নিহত হন। তার মৃত্যু নেতানিয়াহু পরিবারে গভীর প্রভাব ফেলে এবং তিনি ইসরায়েলে কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন।
পরবর্তীতে ভাইয়ের স্মরণে একটি সন্ত্রাসবিরোধী ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন নেতানিয়াহু এবং ১৯৮২ সালে ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের ডেপুটি চিফ অব মিশন নিযুক্ত হন। এতে রাতারাতিই নেতানিয়াহুর জীবন পাল্টে যায়। পরিষ্কার ইংরেজি উচ্চারণ এবং স্বতন্ত্র আমেরিকান অ্যাকসেন্ট নিয়ে তিনি মার্কিন টেলিভিশনে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন এবং ইসরায়েলের একজন দক্ষ মুখপাত্র হিসেবে আবির্ভূত হন।
১৯৮৪ সালে তিনি জাতিসংঘে ইসরায়েলের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৮৮ সালে ইসরায়েলে ফিরে আসার পর রাজনীতিতে যুক্ত হন নেতানিয়াহু এবং লিকুদ পার্টির হয়ে নেসেটে (পার্লামেন্ট) একটি আসন জয় করেন এবং উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন।
পরে নেতানিয়াহু দলের চেয়ারম্যান হন এবং ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী আইজাক রবিনের হত্যাকাণ্ডের পর ইসরায়েলে আগাম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তিনি প্রথম সরাসরি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হন। সেসময় নেতানিয়াহু ছিলেন ইসরায়েলের সবচেয়ে তরুণ প্রধানমন্ত্রী এবং স্বাধীনতা-উত্তর প্রজন্মের প্রথম নেতা।
১৯৯৩ সালের অসলো শান্তি চুক্তির তীব্র সমালোচনা করলেও, নেতানিয়াহু হেবরনের ৮০ শতাংশ অংশ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়ার চুক্তিতে সই করেন এবং অধিকৃত পশ্চিম তীর থেকে আরও অবকাঠামো প্রত্যাহারে সম্মত হন, যা ডানপন্থীদের রোষের কারণ হয়।
১৯৯৯ সালে মেয়াদপূর্তির ১৭ মাস আগেই নির্বাচন আয়োজন করে নিজের সাবেক কমান্ডার লেবার পার্টির নেতা এহুদ বারাকের কাছে হেরে যান নেতানিয়াহু। নেতানিয়াহু লিকুদ পার্টির নেতৃত্ব ছেড়ে দেন এবং অ্যারিয়েল শ্যারন তার স্থলাভিষিক্ত হন।
শ্যারন ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর নেতানিয়াহু আবার সরকারে ফিরে আসেন, প্রথমে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পরে অর্থমন্ত্রী হিসেবে। ২০০৫ সালে তিনি অবরুদ্ধ গাজা থেকে ইসরায়েলিদের প্রত্যাহারের প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন।
২০০৫ সালে শ্যারন বড় ধরনের স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে কোমায় চলে যান এবং লিকুদ পার্টি ছেড়ে নতুন মধ্যপন্থী দল কাদিমা গঠন করেন। তখন নেতানিয়াহু আবার লিকুদ পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০০৯ সালের মার্চে দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।
তিনি পশ্চিম তীরে বসতি নির্মাণে নজিরবিহীনভাবে ১০ মাসের জন্য স্থগিতাদেশ দেন, যার ফলে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরু হয়, কিন্তু ২০১০ সালের শেষ দিকে তা ভেঙে পড়ে।
২০০৯ সালে নেতানিয়াহু ইসরায়েলের পাশে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের শর্তসাপেক্ষে গ্রহণযোগ্যতার ঘোষণা দিলেও, পরে তিনি কঠোর অবস্থানে চলে যান। ২০১৯ সালে এক ইসরায়েলি রেডিওতে তিনি বলেন, ‘ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠিত হবে না, অন্তত যেভাবে মানুষ ভাবছে, তা কখনো হবে না।’
নেতানিয়াহুর শাসনামলে ফিলিস্তিনিদের হামলা এবং ইসরায়েলি সামরিক প্রতিক্রিয়া গাজা উপত্যকায় নিয়মিত সংঘর্ষে রূপ নেয়।
২০১৫ সালের মার্চে নেতানিয়াহু মার্কিন কংগ্রেসে ভাষণ দেন, যেখানে তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মার্কিন চুক্তিকে ‘একটি খারাপ চুক্তি’ বলে অভিহিত করেন। ওবামা প্রশাসন এই সফরকে হস্তক্ষেপমূলক ও ক্ষতিকর হিসেবে নিন্দা জানায়।
২০১৭ সালে ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ইসরায়েল ও মার্কিন নীতির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়। এক বছরের মধ্যেই ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এই পদক্ষেপ আরব বিশ্বে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে—কারণ তারা পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী হিসেবে দাবি করে—তবে এটি নেতানিয়াহুর জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সাফল্য ছিল।
নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সঙ্গে ইরান বিষয়েও একমত হন, যখন ট্রাম্প ২০১৮ সালে ইরানের পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে এসে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করেন।
২০১৬ সালের পর নেতানিয়াহু ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগে তদন্তের মুখে পড়েন। ২০১৯ সালের নভেম্বরে তিনটি আলাদা মামলায় তাকে ঘুষ, জালিয়াতি এবং আস্থাভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ধনী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে উপহার নিয়েছেন এবং গণমাধ্যমে ইতিবাচক কভারেজ পেতে সুবিধা দিয়েছেন।
যদিও নেতানিয়াহু সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং দাবি করেছেন যে, এটি তার বিরুদ্ধে বিরোধীদের একটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র।তারপরও ২০২০ সালের মে মাসে প্রথমবারের মতো ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি বিচারের সম্মুখীন হন।
গাজা ও পরবর্তী সংঘাতের কারণে তার বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়েছে। কারও কারও দাবি, নেতানিয়াহু গাজায় যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চাইছেন যেন তাকে বিচারের মুখোমুখি না হতে হয়।


