মার্কিন গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির মতো অবস্থায় নেই। শুধু তাই নয়, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে তেহরানের অন্তত তিন বছর লাগবে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে এসব তথ্য দিয়েছেন মার্কিন গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ট্রাম্প প্রশাসনের চারজন কর্মকর্তা।
মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা অনুযায়ী, ইরান এখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে ইসরায়েলের হামলার পর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, আকস্মিক এ হামলা ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির করার পথে ঠেলে দিতে পারে।
গত মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দাপ্রধান তুলসি গ্যাবার্ড মার্কিন কংগ্রেসে এক শুনানিতে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সম্প্রদায় এখনো বিশ্বাস করে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ করছে না এবং তেহরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লা খামেনি ২০০৩ সালে যে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি স্থগিত করেছিলেন সেটিকে আবার চালু করার অনুমতি দেননি।’
তবে গ্যাবার্ড বলেছেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত বর্তমানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, যা কোনো পারমাণবিক অস্ত্রহীন দেশের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন।
অথচ, নিজ দেশের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে ভিন্ন মত পোষণ করে ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সুর মিলিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান এখন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গেছে এবং তারা খুব দ্রুত এগোচ্ছে।
নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক বোমা তৈরির গোপন কর্মসূচি বন্ধে আগাম ব্যবস্থা হিসেবে এ হামলা চালানো হয়েছে। তাঁর দাবি, তেহরান ইতিমধ্যে ৯টি পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা অর্জন করেছে।
তবে নেতানিয়াহুর সমালোচকেরা বলছেন, তিনি মূলত অন্য কিছু প্রতিরোধ করতে আগাম পদক্ষেপ নিয়েছেন। সেটা হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নস্যাৎ করা কিংবা নেতানিয়াহু সরকারের পতন ঠেকানো।
৯০ এর দশক থেকেই ইসরায়েল অভিযোগ করে আসছে যে ইরান পরমাণু বোমা তৈরি করতে চাচ্ছে। ইরান বরাবরই বলে আসছে, শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যেই পরমাণু প্রকল্প পরিচালনা করছে তারা৷ তারপরও অনেকের সন্দেহ থাকার পেছনে মূল কারণ হচ্ছে — ইরানের ইউরেনিয়ামের ব্যাপক পরিমাণ মজুদ ও এ বিষয়ে স্বচ্ছতার অভাব।
ইরান এখন ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধতায় সমৃদ্ধ ৪০০ কেজিরও বেশি ইউরেনিয়াম মজুদ করেছে। পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে প্রয়োজন ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম৷ এখনো ইরান সে পর্যায়ে পৌঁছায়নি৷
২০১৫ সালের ঐতিহাসিক জয়েন্ট কমপ্রেহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) চুক্তি অনুযায়ী, ইরান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ১৫ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম ৩.৭ শতাংশের বেশি মাত্রায় সমৃদ্ধ করবে না। এই মাত্রায় সমৃদ্ধ পারমাণবিক জ্বালানি মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো বেসামরিক কাজে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া তারা ৩০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রাখতে রাজি হয়েছিল।
কিন্তু ২০১৮ সালে জেসিপিওএ চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার এবং নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের পর এক বছর পেরোতেই ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচি জোরদার করে। তারা শুধু যে ২০ শতাংশ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করাই শুরু করে তাই-ই নয়, বরং প্রথমবারের মতো তা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করেছে। আইএইএ’র মতে, এই হারে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদনের জন্য দরকারি মানের কাছাকাছি পর্যায়ের।


