মনোবিজ্ঞান – ‘মিলগ্রাম এক্সপেরিমেন্ট’ আনুগত্যে কি আরাম মানুষের?

কল্পনা করুন আপনাকে বলা হলো কেউ একজন ভুল করলেই আপনি তাকে বৈদ্যুতিক শক দেবেন। আপনি জানেন, শকটা তার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কিন্তু আপনার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন কর্তৃপক্ষ। তিনি বলছেন, “চালিয়ে যান, পরীক্ষার প্রয়োজনে আপনাকে চালিয়ে যেতেই হবে।” আপনি কী করবেন? থামবেন, নাকি চালিয়ে যাবেন?

এই প্রশ্নই ১৯৬১ সালে স্ট্যানলি মিলগ্রাম নামের এক আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী তার বিখ্যাত পরীক্ষায় সামনে এনেছিলেন। আজ প্রায় ছয় দশক পরেও এই পরীক্ষা শুধু মনোবিজ্ঞানে নয়, রাজনীতি, প্রশাসন, যুদ্ধাপরাধ এবং আধুনিক সমাজের নৈতিকতা বিশ্লেষণের অন্যতম মানদণ্ড হয়ে আছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে জার্মান নাৎসি সেনাদের বিচার চলাকালীন সময়ে একটা প্রশ্ন সামনে উঠে আসে, “এতো এতো গণহত্যা, এতো বর্বরতা কিভাবে সম্ভব হয়েছিলো?” অভিযুক্তরা প্রায় সবাই একই সুরে জবাব দিয়েছিলো, “তারা আদেশ পালন করেছে।” এই নিঃস্পৃহ জবাবে ভীত ও বিস্মিত হয়ে উঠেছিলো গোটা দুনিয়া। স্ট্যানলি মিলগ্রাম এই বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে চাইলেন, সাধারণ মানুষও কি এমন অন্ধভাবে কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মানতে পারে যে নৈতিকতা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে?

পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিকে বলা হতো, সে একজন শিক্ষক। সে তার অদৃশ্য ‘ছাত্র’কে প্রশ্ন করছে, এবং ভুল উত্তরের জন্য শাস্তি হিসেবে বৈদ্যুতিক শক দিচ্ছে। শক ১৫ ভোল্ট থেকে শুরু করে ৪৫০ ভোল্ট পর্যন্ত বাড়ানো হতো। ছাত্রটি সম্পর্কে শিক্ষক কিছুই জানেন না। শিক্ষক যখন দ্বিধায় পড়েন, তখন পরীক্ষক (authority figure) নিরপেক্ষ গলায় বলেন “চালিয়ে যান।” “পরীক্ষার জন্য এটা আপনাকে চালিয়ে যেতে হবে।” “আপনার অন্য কোনো বিকল্প নেই।”

ফলাফল ছিলো চমকপ্রদ, প্রায় ৬৫% অংশগ্রহণকারী ৪৫০ ভোল্ট পর্যন্ত শক দেন, অপরদিক থেকে ‘ছাত্র’ চিৎকার করে বলছে “আমার হৃদরোগ আছে!”, “আমি আর নিতে পারছি না!” এসব শুনে শুনে কেউ কেউ ঘেমে যাচ্ছেন, আতঙ্কিত হচ্ছেন, কিন্তু শাস্তি দিয়েই যাচ্ছেন!

মিলগ্রাম বলেন এটি Agentic State। এই অবস্থা তখন ঘটে যখন মানুষ নিজেকে ‘সিদ্ধান্তের কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে না দেখে বরং ‘নির্দেশের বাহক’ হিসেবে দেখে। ফলে নৈতিক দায়বদ্ধতা তার উপর আর থাকে না। সে মনে করে যা হচ্ছে তার দায় মূলত নির্দেশদাতার।এটি শুধু একাডেমিক ধারণা নয়। বাস্তব জীবনেও আমরা এর নমুনা দেখেছি, আবু ঘরিব কারাগারে মার্কিন সেনাদের অমানবিকতা, রুয়ান্ডার গণহত্যা, পাকিস্তানি সেনাদের ১৯৭১ সালের হত্যাযজ্ঞ। এইসব ক্ষেত্রে অনেকে বলেছিলেন “আমি ত শুধু আদেশ পালন করেছিলাম।” অর্থাৎ ‘মিলগ্রাম মুহূর্ত’ বারবার ফিরে আসে।

কর্তৃত্বের প্রতি আমাদের আনুগত্য অনেকাংশেই সামাজিকভাবে গঠিত। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় অনুশাসন সব জায়গাতেই “প্রশ্ন না করে মেনে চলা” শেখানো হয়। শিশুদের শেখানো হয়, “বড়দের কথা না শুনলে শাস্তি হবে”। এই শেকড়েই মিলগ্রামের পর্যবেক্ষণ প্রোথিত। এই প্রবণতা প্রশাসনিক, রাজনৈতিক বা সামরিক কাঠামোতে ভয়ঙ্কর রূপ নেয়। একজন পুলিশ অফিসার বা সরকারি কর্মচারী কখনো কখনো অনৈতিক নির্দেশ পালন করেন শুধু ‘উপরের আদেশ’-এর খাতিরে। বাংলাদেশেও এমন বহু ঘটনার নজির রয়েছে।

মিলগ্রামের এক্সপেরিমেন্ট যুগান্তকারী হলেও এর সীমাবদ্ধতাও আছে। অনেকে বলেন এটি নাটকীয় এবং আর্টিফিশিয়াল পরিস্থিতি। কেউ কেউ হয়তো বুঝে গিয়েছিলেন এটি একটি অভিনয়। আবার অংশগ্রহণকারীদের মানসিক চাপের মাত্রাও প্রশ্নবিদ্ধ।

এছাড়া এখনকার গবেষণা নীতিমালায় এই ধরনের পরীক্ষাকে “Ethically problematic” ধরা হয়। তবুও জেরি বার্গার ২০০৯ সালে কিছু নিরাপদ পরিবর্তনসহ পুনরায় পরীক্ষাটি চালান এবং প্রায় একই রকম ফল পান।

বর্তমান বিশ্বে যেখানে রাজনৈতিক মেরুকরণ, ভুয়া তথ্য, দমন-পীড়নমূলক রাষ্ট্রযন্ত্র ও নেতা-পূজার সংস্কৃতি বেড়ে চলেছে, সেখানে মিলগ্রামের গবেষণা আরো বেশি প্রাসঙ্গিক।

যখন কেউ বলে “আমি কেবল কর্তৃপক্ষের নিয়ম মেনে চলেছি”, তখন আমাদের প্রশ্ন করা উচিত “এই নিয়ম কি ন্যায্য ছিলো?” নৈতিকতা কি কেবলই নির্দেশ পালন, না কি কখনও সেটিকেও প্রশ্ন করা? মিলগ্রামের এক্সপেরিমেন্ট আমাদের বলে দেয় একজন সাধারণ মানুষও চরম অমানবিক সিদ্ধান্তে যেতে পারে, যদি সে তার সম্পূর্ণ বিবেককে কর্তৃপক্ষের কাছে সঁপে দেয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন