নার্সিসিজমেরও আছে ভালো দিক, বদলে দিতে পারে সমাজ

আমরা যখন ‘নার্সিসিজম’ শব্দটি শুনি, তখন প্রথমেই যা মনে আসে তা হলো অতিরিক্ত আত্মপ্রেম, অহংকার, অথবা এমন কাউকে যিনি নিজের চেহারা, অর্জন বা কথা নিয়ে অকারণে গর্ব করেন। এমন কাউকে আমরা সচরাচর অপছন্দ করি। কারণ সমাজ আমাদের শিখিয়েছে, ‘নিজেকে বড় ভাবা খারাপ’। কিন্তু আজকের আলোচনায় আমরা একটু ভিন্নভাবে ভাবতে চাই।

আমরা খুঁজে দেখতে চাই এই যে আত্মমুগ্ধতা, এই যে ‘নিজেকে নিয়ে মুগ্ধ থাকা’ তা কি একেবারেই খারাপ? না কি এর ভেতরে লুকিয়ে থাকতে পারে কিছু সামাজিক প্রয়োজন? হয়তো অবাক হবেন শুনে, কিন্তু মনোবিজ্ঞান ও সমাজতত্ত্ব বলছে, নার্সিসিজমের মধ্যেও রয়েছে উপকারিতা, বিশেষ করে যখন তা নিয়ন্ত্রিত এবং সচেতনভাবে ব্যবহৃত হয়।

নার্সিসিজম শব্দটি এসেছে গ্রিক পুরাণের চরিত্র ‘নার্সিসাস’ থেকে, যে নিজের প্রতিবিম্বে এতটাই মুগ্ধ হয়ে পড়ে যে, সেখানেই ডুবে মারা যায়। সেই কাহিনির মতোই, আধুনিক মনোবিজ্ঞানে নার্সিসিজম বলতে বোঝানো হয় এমন এক ব্যক্তিত্ব, যেখানে ব্যক্তি নিজেকে কেন্দ্র করে চিন্তা করে, নিজের কৃতিত্বে আনন্দিত হয় এবং অন্যদের প্রশংসা কামনা করে।

তবে এই বৈশিষ্ট্যটি একেবারে অস্বাভাবিক নয়। বরং আধুনিক মনোবিজ্ঞান বলছে প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই কম-বেশি নার্সিসিজম থাকে এবং তা প্রয়োজনীয়ও। একে বলা হয় “Healthy Narcissism” যেখানে ব্যক্তি আত্মবিশ্বাসী, নিজেকে ভালোবাসে, কিন্তু অপরকেও ছোট করে দেখে না।

নার্সিসিজম সমাজে কীভাবে উপকারী ভূমিকা রাখে?

যেকোনো বড় পরিবর্তনের পেছনে যিনি থাকেন, তিনি সাধারণত নিজের ওপর প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী হন। সেই আত্মবিশ্বাস অনেক সময় বাহ্যিকভাবে ‘অহং’ বলেই মনে হয়, কিন্তু বাস্তবে সেটিই তাঁকে ঝুঁকি নিতে শেখায়, ভিন্নভাবে ভাবতে বাধ্য করে।

শিল্পী, কবি, পরিচালক বা ডিজাইনাররা অনেক সময় নিজেদের কাজ নিয়ে গর্বিত থাকেন। তারা মনে করেন, ‘এই সৃষ্টি অন্যদের ছুঁয়ে যাবে।’ এ বিশ্বাস ছাড়া কেউ শিল্পচর্চা করতে পারে না। একে বলা যেতে পারে সৃষ্টিশীল নার্সিসিজম যেখানে নিজের মূল্য বুঝে তা প্রকাশের মাধ্যমে সমাজে নতুন কিছু দেওয়া হয়।

সামাজিকভাবেও এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সমাজ যাদের সাহসী কণ্ঠ পায়, তারাই সমাজকে বদলায়। আত্মপ্রেম অনেক সময় সেই সাহস জোগায়।

আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে আত্মপ্রচারের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। আপনি যত ভালো হোন না কেন, যদি নিজেকে তুলে ধরতে না পারেন, তাহলে আপনি অনেকাংশেই অদৃশ্য। নার্সিসিস্টিক বৈশিষ্ট্য অনেক সময় মানুষকে আত্মপ্রচারে দক্ষ করে তোলে। এই আত্মপ্রচার যদি শুধুই গর্ব না হয়ে, নিজের কাজের কার্যকারিতা ও প্রভাব তুলে ধরার মাধ্যম হয়, তবে তা সমাজের জন্যও সহায়ক।

মানুষ যখন দেখে কেউ নিজের অর্জন নিয়ে খুশি, বা প্রকাশ্যে বলে, “আমি পারি”—তখন অনেকেই মনে মনে ভাবে, “আমি কেন পারবো না?” এটি একধরনের সামাজিক প্রতিযোগিতা তৈরি করে। হিংসা নয়, বরং অনুপ্রেরণার জন্ম দেয়। এভাবেই একাধিক ব্যক্তি উন্নতির দিকে এগোয়, সাথে সমাজে সাফল্যের সংস্কৃতি তৈরি হয়।

স্বাস্থ্যকর নার্সিসিজম ব্যক্তি ও সমাজকে মানসিকভাবে স্থিতিশীল রাখে। যখন একজন ব্যক্তি নিজের মূল্য জানেন, নিজের সক্ষমতা বোঝেন, তখন তাঁর আত্মসম্মান অন্যের কথায় ভেঙে পড়ে না। তিনি জানেন, তিনি কে, কী চান এবং কী করতে পারেন। এমন ব্যক্তি সমাজের চাপ ও ব্যর্থতা মোকাবিলায় দৃঢ় থাকেন। এটি এক ধরনের আত্মরক্ষামূলক বৈশিষ্ট্য, যা ক্রমবর্ধমান মানসিক অসুস্থতার যুগে আশার আলো হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশি সমাজে ‘নম্রতা’ ও ‘বিনয়’ এমনভাবে রোপিত হয়েছে, অনেক সময় আত্মবিশ্বাসকেও অহংকার বলে ভুল করা হয়। ফলে যারা আত্মপ্রচারে পারদর্শী, বা নিজের কথা নিজে বলতে পারে, তারা সহজেই “অহংকারী” বা “ভণ্ড” ট্যাগ পেয়ে যায়।

অথচ একই সমাজে আমরা ‘নেতা’, ‘সেলিব্রিটি’, কিংবা ‘উদ্যোক্তা’দের সম্মান করি, যারা প্রায়শই নিজেদের শক্তভাবে উপস্থাপন করেন।এই দ্বিচারিতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে নার্সিসিজমের প্রয়োজনীয়তা। নতুন প্রজন্ম আত্মবিশ্বাসী, তারা নিজেদের কাজ নিয়ে গর্বিত।সোশ্যাল মিডিয়া তাদের একটি প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে। তবে এই আত্মপ্রচারে যেন দম্ভ না আসে, সেই শিক্ষা ও সচেতনতা জরুরি।

কখন নার্সিসিজম ক্ষতিকর হয়ে ওঠে?

যখন কেউ কেবল নিজেকে কেন্দ্র করে সমাজ বা পরিবারের কাঠামো ভেঙে ফেলেন, তখন সেটা ভয়ংকর হয়। অতিরিক্ত আত্মমুগ্ধতা ব্যক্তি ও সমাজ দু’টোকেই বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এমন মানুষ সহানুভূতিশীল হন না, সমালোচনা নিতে পারেন না, এবং অন্যের প্রয়োজনীয়তা অবহেলা করেন। এতে সৃষ্টি হয় Toxic Narcissism যা সম্পর্ক, সমাজ ও মূল্যবোধকে ধ্বংস করে দেয়।

অসুস্থ narcissism আত্মকেন্দ্রিকতা তৈরি করে, কিন্তু স্বাস্থ্যকর narcissism আত্মমর্যাদা শেখায়। যদি আমরা আমাদের শিশুদের শিখাই “নিজেকে ভালোবাসো, কিন্তু অন্যকে উপেক্ষা কোরো না”, তাহলে তারা হয়ে উঠবে আত্মবিশ্বাসী, কিন্তু সহানুভূতিশীল মানুষ।

এই যুগে যেখানে পরিচিতি, আত্মপ্রকাশ ও ব্যক্তিত্বের প্রতিযোগিতা প্রতিনিয়ত চলছে সেখানে নার্সিসিজমকে একপাক্ষিকভাবে খারাপ বললে চলবে না। বরং প্রয়োজন “সচেতন আত্মপ্রেম”—যেটা নিজেকে গড়তে এবং সমাজে অবদান রাখতে সাহায্য করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন