একটা সময় ছিল, নিজের একটা বাড়ি হবে—এটা শুধু একটি আবেগ নয়, বরং সমাজে প্রতিষ্ঠা, নিরাপত্তা ও সাফল্যের প্রতীক ছিল। এটি বাবা-মায়ের প্রজন্মের কাছে আত্মপরিচয়ের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। কিন্তু সময় বদলেছে। আজকের তরুণ সমাজ বিশেষ করে শহরকেন্দ্রিক মিলেনিয়াল ও জেন-জি প্রজন্ম এই স্বপ্নকে অতীতের একটি অবাস্তব ধ্যান হিসেবেই দেখতে শুরু করেছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে শহরের বাস্তবতা, জমির দাম, বাড়িভাড়ার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, আয়-ব্যয়ের অসমতা এবং একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে ‘নিজের বাড়ি’ একটি অলীক জগতে আটকে গেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) ২০২২ সালের তথ্যে দেখা যায়, শুধুমাত্র ঢাকাতেই ৭৪% পরিবারের কোনো নিজস্ব বাসস্থান নেই; তারা ভাড়ায় থাকে। এর মধ্যে ২৫–৩৫ বছর বয়সী তরুণদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তারা অধিকাংশই চাকরিজীবী বা নতুন উদ্যোক্তা, যাদের আয় বাসা কেনার বাজারমূল্যের তুলনায় অপ্রতুল।
আর একটি গবেষণা “Buyer’s Sentiment Report 2022” বলছে, ঢাকায় একটি ১২০০ স্কয়ার ফিট ফ্ল্যাট কিনতে গড় খরচ প্রায় ৯০ লাখ টাকা, যেখানে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের গড় মাসিক আয় হয়ত ৩০–৪০ হাজার টাকা। এই হিসেবে কোনো সঞ্চয় ছাড়াই টানা ২০–২৫ বছর মাসিক আয়ের পুরোটাই জমিয়ে রাখলে একটি ফ্ল্যাট কেনা সম্ভব—এটি প্রায় অসম্ভব কল্পনা।
শুধু বাংলাদেশ নয় এ প্রবণতা বিশ্বব্যাপী। যুক্তরাষ্ট্রের “Federal Reserve”-এর ২০২০ সালের এক জরিপ বলছে, বেবি বুমাররা যখন ৩৫ বছর বয়সে পৌঁছেছিল, তখন তারা জাতীয় সম্পদের ২১% নিয়ন্ত্রণ করত; সেখানে আজকের মিলেনিয়ালরা একই বয়সে কেবল ২-৫% সম্পদের মালিক।
বাংলাদেশে BIDS (২০২৩) পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৬৮% তরুণ মনে করেন তারা জীবনে কোনোদিন নিজস্ব বাড়ির মালিক হতে পারবেন না। এদের অনেকে মনে করেন, ‘ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন দেখা মানেই নিজেকে হঠাৎ ধনী ভাবার মতো নির্বোধ কল্পনা’।
বাড়িভাড়া শুধু অর্থনৈতিক চাপ নয়, এটি এক ধরনের মানসিক অনিরাপত্তাও তৈরি করে। ঢাকায় ভাড়ার গড় বৃদ্ধি প্রতি বছরে ৮–১২%, যা অনেকের আয়ে সামঞ্জস্যহীন। ফলে শহরের একজন সাধারণ তরুণ জীবনের অন্তত ৫–৭ বার বাসস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগ ২০২৪ সালে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ৩০–৩৫ বছর বয়সী শহুরে তরুণদের মধ্যে ৫৭% মনে করেন, “নিজস্ব বসতবাড়ির অভাবে তারা পরিবার গঠনে অনিচ্ছুক বা অনিরাপদ বোধ করেন।” এই গবেষণা আরও বলছে, ৪২% অংশগ্রহণকারী মনে করেন, “প্রতিনিয়ত বাসা বদলানোর অভিজ্ঞতা তাদের আত্মপরিচয় ও স্থায়িত্ববোধে প্রভাব ফেলেছে।”
যেহেতু নিজস্ব বাসা পাওয়া কঠিন, তাই তরুণ প্রজন্ম নতুন বিকল্পের দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশে “co-living” বা শেয়ারড হাউজিং সংস্কৃতি সম্প্রতি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এতে একাধিক তরুণ একই বাসায় বসবাস করে খরচ ভাগ করে নেয়, যার ফলে সাশ্রয় হয় এবং সামাজিক বন্ধনও গড়ে ওঠে।
২০২৩ সালে “BDProperty Insights” একটি সমীক্ষায় জানায়, ঢাকা শহরে ৭৫টির বেশি কমার্শিয়াল কো-লিভিং স্পেস গড়ে উঠেছে মোহাম্মদপুর, উত্তরা ও মিরপুর অঞ্চলে। এই নতুন বাসস্থান চিন্তা একদিকে যেমন সম্ভাবনা, তেমনই ‘নিজের ঘর’ ভাবনার অবসানের ইঙ্গিতও বটে।
পুরনো প্রজন্ম যেখানে ঘরকে দেখেছে মালিকানা ও জমির ভিত্তিতে, সেখানে নতুন প্রজন্ম ঘরকে দেখছে “স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা”-র জায়গা হিসেবে। অনেক তরুণ এখন বলেন, “আমার ঘর মানে এমন এক জায়গা, যেখানে আমি আমার মতো করে বাঁচতে পারি, মালিকানা থাক বা না থাক।”
বিশ্বজুড়ে এখন এক ধরণের “post-ownership” দর্শন গড়ে উঠছে—যেখানে ‘ব্যবহার’ই মুখ্য, মালিকানা নয়। AirBnB, co-living, rent-to-live—সবকিছু মিলে নতুন বাসস্থান দৃষ্টিভঙ্গি জন্ম নিচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো বাসস্থান নীতির পুনর্বিবেচনা। সরকার ও নীতিনির্ধারকদের উচিত, নতুন প্রজন্মের বাস্তবতা বুঝে সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প, অল্প সুদে হাউজিং লোন এবং ভাড়াটিয়াদের অধিকার সুরক্ষা বিষয়গুলোতে মনোযোগ দেওয়া।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেমন, মালয়েশিয়া বা ভিয়েতনামে “Young Housing Scheme” চালু হয়েছে বাংলাদেশেও তেমন করে “তরুণদের জন্য আবাসিক পরিকল্পনা” শুরু করা দরকার। না হলে শহরের একটি বড় অংশ ভবিষ্যতেও ‘স্থায়ীভাবে অস্থায়ী’ থেকেই যাবে।
‘নিজের বাসা’ এই ভাবনাটি হয়তো আগামী প্রজন্মের জন্য আর অর্থবহ থাকবে না। ভাড়া-কেন্দ্রিক সমাজ একদিকে জীবনের গতি বাড়াচ্ছে, কিন্তু অপরদিকে আত্মিক সংযোগ, পারিবারিক গঠন এবং স্থায়িত্ববোধকে দুর্বল করছে।
তবুও আশাবাদের জায়গা থেকে বলা যায় যদি নীতিমালায় পরিবর্তন আনা যায়, আবাসন খাতে সমতা ও সহনশীলতা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে হয়তো আগামী প্রজন্মের হোম নিশ্চিত হবে।


