ধরুন কেউ বলছে “যতদিন প্রাণ আছে, ততদিন ভোগ করো। ঋণ করে হলেও ঘি খাও। মৃত্যু মানেই চূড়ান্ত, পরলোকে কিছু নেই।” এই বক্তব্য শুনে আপনার প্রথমে মনে হতে পারে, ‘আরে! এ তো নির্লজ্জ ভোগবাদ!’ কিন্তু একটু গভীরে গেলে বুঝবেন, এটি আসলে একটি শক্তিশালী দর্শনের সারকথা, যা হাজার বছর আগে থেকেই ভারতের মূলধারার ধর্ম ও আধ্যাত্মবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যুক্তির আওয়াজ তুলেছিল।
চার্বাক বা লোকায়ত দর্শন শ্রুতির ঊর্ধ্বে গিয়ে যুক্তি ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সত্য যাচাই করতে চাইত। যখন বেদ, উপনিষদ আর পুরাণগুলি আত্মা, পরকাল, পুনর্জন্ম, ব্রহ্ম ইত্যাদি জটিল তত্ত্বে বিশ্বাস করতে শেখাচ্ছিল, তখন চার্বাকরা বলছিল, “যা দেখা যায় না, শোনা যায় না, ছোঁয়া যায় না—তা নিয়ে মাথা ঘামানো বৃথা।”
চার্বাকদের দাবি ছিল, প্রত্যক্ষই একমাত্র প্রমাণ। অনুমান, উপমান, শব্দ কোনোটাই বিশ্বাসযোগ্য নয়, কারণ সেগুলো সহজেই ভুল প্রমাণিত হতে পারে।যদি কেউ বলে, আগুন ধোঁয়া তৈরি করে, তাই যেখানে ধোঁয়া সেখানে আগুনও আছে, এটা অনুমান। কিন্তু মেঘ থেকেও তো ধোঁয়া বা কুয়াশার মতো কিছু ওঠে, তাহলে সেটা ভুল প্রমাণ হতে পারে। অতএব তারা বলল যা চোখে দেখা যায়, স্পর্শ করা যায়, অনুভব করা যায়, কেবল সেটাই সত্য।
চার্বাক দর্শনের সবচেয়ে আলোড়ন তোলা দিক ছিল ঈশ্বর ও আত্মা-বিরোধিতা। এরা বলতো, “আত্মা বলে কিছু নেই। শরীরটাই সব। শরীর নষ্ট হলে চেতনা ও চিন্তা সব শেষ।” যেভাবে আগুন নিভে গেলে তাপ থাকে না, ঠিক তেমনই শরীর মরে গেলে মনের অস্তিত্ব থাকে না। চার্বাকরা ‘মন’, ‘চিন্তা’, ‘স্মৃতি’ ইত্যাদিকেও শরীরের বৈশিষ্ট্য হিসেবেই ব্যাখ্যা করত।
ঈশ্বর? তারা বলত, “যদি ঈশ্বর থাকে, তবে দুনিয়ায় এত দুঃখ, যুদ্ধ, অন্যায় কেন? একজন ন্যায়বান সর্বশক্তিমান ঈশ্বর এসব সহ্য করতেন কেন?” এইরকম প্রশ্ন তারা ধর্মপ্রধান সমাজের মুখে ছুঁড়ে দিয়েছিল এবং প্রত্যুত্তরে নিগ্রহ পেয়েছে।
চার্বাকদের যুক্তি শুধু দর্শনের জগতে নয়, সমাজের মূল কাঠামোতেও আঘাত করেছিল। বেদ ও তার অনুসারী সমাজ যে যজ্ঞ, তপস্যা, পুজো, ব্রাহ্মণদের শ্রেষ্ঠত্ব ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত ছিল, চার্বাকরা সেগুলোকেই ভণ্ডামি বলেছিল। তারা বলত “যজ্ঞ করে স্বর্গ লাভ হবে কে বলেছে? কেউ কি ফিরে এসে জানিয়েছে স্বর্গ আছে? একদল পুরোহিত কেবল ঘি ঢেলে আগুনে টাকা পুড়িয়ে দিচ্ছে!” এই বিদ্রোহী কথাগুলোর জন্য চার্বাক দর্শন কখনোই মূলধারার অংশ হতে পারেনি। বেদ-ভিত্তিক সমাজ তাদের “নাস্তিক”, “অশুচি”, “ভোগবাদী” বলে আখ্যা দেয়। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে এরা ছিল যুক্তিনিষ্ঠ বাস্তববাদী।
চার্বাক দর্শনের নাম ‘চার্বাক’ নামক এক ব্যক্তির নাম থেকে বলে প্রচলিত। আবার কেউ কেউ বলেন ‘চারু-বাক’ (সুন্দর বাক্য) থেকেই এসেছে নামটি।এই দর্শনকে অনেক সময় ‘লোকায়ত’ নামেও ডাকা হয়, যার অর্থ ‘মানুষের মধ্যে প্রচলিত’।
তবে দুঃখের বিষয়, চার্বাকদের নিজের লেখা কোনো গ্রন্থ আমাদের হাতে নেই। সব তথ্যই আমরা পাই বৌদ্ধ, হিন্দু বা জৈন দার্শনিকদের সমালোচনার মাধ্যমে। শঙ্করাচার্য, ধর্মকীর্তি, জৈন আচার্য হরিবদ্র, প্রভৃতিরা চার্বাকদের মত খণ্ডন করতে গিয়ে তাদের মতামতের উল্লেখ করেছেন।
তাহলে চার্বাক কি কেবল ভোগবাদ?
প্রচলিত ভুল ধারণা হলো চার্বাকরা কেবলমাত্র ভোগবাদে বিশ্বাস করত। অথচ বিষয়টা আরো সূক্ষ্ম। চার্বাকরা বিশ্বাস করত, যেহেতু জীবনের পর মৃত্যু ছাড়া কিছু নেই, তাই জীবনের মধ্যেই আনন্দ ও মুক্তির সন্ধান করো। এই দর্শন বলছিল, যতদিন দেহ আছে ততদিন জীবন অতএব দেহ ও ইন্দ্রিয়কেই মর্যাদা দাও।
এরা বলত না যে সমাজ ভেঙে দাও, বরং চেয়েছে সমাজ যেন অন্ধ বিশ্বাসে না চলে। এরা বলত না যে নৈতিকতা বাতিল করো, বলত নৈতিকতা যেন ভয়ের বা প্রলোভনের উপর না দাঁড়িয়ে যুক্তির উপর দাঁড়ায়।
বস্তুত চার্বাক দর্শন আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তার এক প্রাচীন সংস্করণ। আজকের দিনেও যখন আমরা কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, ধর্মীয় উন্মাদনা দেখি, তখন চার্বাকের যুক্তিনির্ভর কণ্ঠ আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। যেসব সমাজ এখনো প্রমাণ ছাড়া বিশ্বাসে ডুবে আছে, সেসব সমাজের জন্য চার্বাক একটি দর্পণ।
চার্বাক দর্শন হয়তো প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের মূলধারায় স্থান পায়নি, কিন্তু এর প্রভাব চিরস্থায়ী। ইউরোপে যখন ১৭শ-১৮শ শতকে যুক্তিবাদী আন্দোলন, বস্তুবাদ, এনলাইটেনমেন্ট শুরু হয়, তখন ভারতীয় চিন্তার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় চার্বাকরা তা বহু শতাব্দী আগেই বলে গেছে। এটা শুধু একটি দর্শন নয়, এটি যুক্তি, স্বাধীন চিন্তা ও সত্যের পক্ষ নেওয়ার সাহস।


