নজরদারির পুঁজিবাদ – কিভাবে কোথায় নিজেদের অজান্তেই আমরা বিক্রি হচ্ছি?

ধরুন আপনি বন্ধুর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে চ্যাট করছেন, কথায় কথায় উঠে এলো “সফট ট্যুরিজম” শব্দটা। পরদিন ইন্সটাগ্রাম ও ফেসবুকে ঢুকতেই আপনার নিউজফিডে ভেসে উঠলো ‘সাস্টেইনেবল ট্রাভেল’ নিয়ে স্পনসর্ড পোস্ট। একি কাকতালীয়? নাকি পরিকল্পিত নজরদারি? এই নজরদারিরই এক পরিণতি হচ্ছে Surveillance Capitalism। এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে আমাদের ব্যক্তিগত জীবনই হয়ে উঠেছে বেচাকেনার পণ্য।

Surveillance Capitalism শব্দটি জনপ্রিয় করে তুলেছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর Shoshana Zuboff। তাঁর মতে এই নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কর্পোরেশনগুলো আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে, বিশ্লেষণ করে এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য আচরণ অনুমান করে ব্যবসায়িক লাভ করে।Google, Facebook, Amazon—এইসব কোম্পানি আমাদেরকে “ফ্রি” সেবা দেয় বলে মনে হলেও, আদতে আমরা নিজেরাই এই বিনিময়ের পণ্য। আমাদের প্রতিটি ক্লিক, টাইপ, ভিউ, এমনকি আমাদের অনলাইন নীরবতাও ট্র্যাক করা হয়।

Zuboff বলছেন এটা শুধু নজরদারি নয় এটা এক ধরণের চলমান আচরণীয় নিয়ন্ত্রণ। এই ব্যবস্থায় আমাদের আচরণ শুধুই পর্যবেক্ষণ করা হয় না, বরং নির্দিষ্টভাবে প্রভাবিতও করা হয়, যাতে আমরা নির্ধারিত পণ্যে বা মতাদর্শে প্রলুব্ধ হই।

একটা সাধারণ মোবাইল অ্যাপ ইনস্টল করতে গিয়ে আমরা কত তথ্য দিয়ে দিই। লোকেশন, কন্ট্যাক্ট, গ্যালারি অ্যাক্সেস, এমনকি আমাদের ফোনে আর কী অ্যাপ আছে সেটাও। এইসব তথ্য বিশ্লেষণ করে আমাদের সম্পর্কে বানানো হয় “consumer profile”।

অবাক হবেন, তথ্য ব্যবসা এখন তেল বা স্বর্ণের থেকেও লাভজনক। ২০২৩ সালের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ডেটা ইন্ডাস্ট্রির বাজারমূল্য প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার ছুঁয়েছে। অথচ এই বাজারে তথ্যদাতাদের অর্থাৎ আমাদের প্রায় কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আমরা জানিই না কোন কোম্পানি আমাদের কী তথ্য নিচ্ছে, কিভাবে ব্যবহার করছে।

তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া এতটাই নিখুঁত এবং গোপন যে অনেকেই তা টেরই পান না। আপনি যখন অনলাইনে কিছু পড়ছেন, পেছনে চলতে থাকে ট্র্যাকিং কোড, স্ক্রিপ্ট, কুকিজ, যেগুলো আপনার মনোযোগের প্রতিটি পদক্ষেপকে ধরে রাখে।

এই তথ্যগুলো কেবল পণ্যের জন্য ব্যবহৃত হয় না, ব্যবহার হয় মানুষের মনোভাব পাল্টানোর জন্য। ধরুন আপনি কিছুদিন ধরে হতাশায় আছেন সার্চ হিস্টরি, ঘুমানোর টাইম, মোবাইল ব্যবহার সবই তা বলে দেবে। এবার বিজ্ঞাপনদাতা জানে আপনি কোন সময়ে কোন বার্তায় সবচেয়ে দুর্বল হবেন। এখানেই Surveillance Capitalism-এর আসল খেলা।

২০১৮ সালের মার্চ মাসে Cambridge Analytica কেলেঙ্কারির খবর ফাঁস হয়। এটি ছিল এক ব্রিটিশ ডেটা অ্যানালিটিক্স ফার্ম, যারা Facebook-এর প্রায় ৮৭ মিলিয়ন ব্যবহারকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে “psychological profiling” তৈরি করেছিল।

তারা একটি ফেসবুক অ্যাপ ব্যবহার করেছিল যেটি ব্যবহারকারীদের “Personality Quiz” খেলার নামে তাদের তথ্য এবং তাদের ফ্রেন্ড লিস্ট থেকে ডেটা টেনে নিত। Cambridge Analytica দাবি করে তারা মানুষকে “manipulate” না করে “influence” করেছিল। কিন্তু এই প্রভাব এমনভাবে ছিল যে, তা ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং ব্রেক্সিট ভোটে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল বলেও অভিযোগ ওঠে।

Cambridge Analytica প্রমাণ করে দিয়েছে, আজকের দিনে তথ্য মানেই রাজনৈতিক শক্তি। আপনি যে খবরটা পড়লেন, যে পোস্টটা শেয়ার করলেন সবকিছুই কিন্তু নিয়ন্ত্রিত হতে পারে একটি অদৃশ্য কোম্পানির হাতে।

অনেকে ভাবেন Surveillance Capitalism কেবল আমেরিকা-ইউরোপে ঘটে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষত বাংলাদেশেও, এই প্রক্রিয়া গোপনে কাজ করছে। আপনি বিকাশ, নগদ বা অন্য কোনো ডিজিটাল সেবা ব্যবহার করেন? আপনি ফেসবুকে পণ্যের কমেন্টে আগ্রহ দেখান? সবকিছু advertising algorithm-এর রেকর্ডে যাচ্ছে।

আমাদের দেশে ডেটা প্রোটেকশন আইন এখনো অনেক দুর্বল। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো কীভাবে তথ্য ব্যবহার করছে, তা জানার বা বাধা দেওয়ার পর্যাপ্ত আইনি সুযোগ পর্যন্ত নেই।

এই বাস্তবতায় আমরা কী করতে পারি?

আমাদের জানতে হবে কোন অ্যাপ কী তথ্য নেয়, কেন নেয়। আমাদের দরকার ডেটা অধিকার আইন যেখানে ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত হলে, তাতে আমাদের সম্মতি প্রয়োজন হবে। বিনামূল্যে সবকিছু ব্যবহার মানেই হয়তো আমরা নিজেরাই বিক্রি হয়ে যাচ্ছি, এই উপলব্ধিটা জরুরি। বড় কর্পোরেশন ও সরকারের কাছে স্বচ্ছতা চাইতে হবে, তাদের Surveillance Practices কি ন্যায়সঙ্গত?

Surveillance Capitalism এখন এমন এক বাস্তবতা, যেখানে আমরা নিজেরাও বুঝি না আমরা পর্যবেক্ষণাধীন। Cambridge Analytica কেলেঙ্কারি ছিল এর একটি চূড়ান্ত প্রমাণ। তথ্য সংগ্রহ আজ আর নিরীহ প্রযুক্তি নয় এটা এক রাজনৈতিক অস্ত্র।

আমরা যদি গোপনীয়তার দাবি না তুলি, যদি আমাদের তথ্যের উপর আমাদের অধিকার স্বীকার না করি তবে ভবিষ্যতের নাগরিক সমাজ শুধু পর্যবেক্ষিত” হবে না, পরিচালিতও হবে। মনে রাখা দরকার এখানে এই গোপনীয়তা মানে লুকানো নয়, নিজের মতো নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন