বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘বটতলার বই’ একটি বিস্মৃত, তবুও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। ১৮শ ও ১৯শ শতকের কলকাতার বটতলা অঞ্চলে জন্ম নেওয়া এই সাহিত্যের ধারা একদিকে যেমন অল্প শিক্ষিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পাঠ–আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেছিল, অন্যদিকে এটি ছিল বাংলার প্রাক-আধুনিক গণসাংস্কৃতিক চেতনার অন্যতম উজ্জ্বল প্রতিফলন। এক সময় যেসব বই তথাকথিত ‘চটুল’ কিংবা ‘অসুন্দর’ আখ্যায় অবমূল্যায়িত হয়েছিল, আজ তারাই গণসাহিত্যের সমাজ-মনস্তত্ত্ব ও উপনিবেশ-পরবর্তী পাঠব্যবস্থার মূল্যবান নিদর্শনে পরিণত হচ্ছে।
ঊনবিংশ শতকের গোড়ার দিকে কলকাতায় ইংরেজি শিক্ষার প্রসার, ছাপাখানার প্রতিষ্ঠা এবং কাগজের সহজলভ্যতা বাংলা ভাষায় এক নতুন সাহিত্যিক চর্চার জন্ম দেয়। এই সময় উচ্চশিক্ষিত সমাজ ‘আধুনিক সাহিত্য’ নির্মাণে মনোনিবেশ করলেও, নিম্নবর্গীয় জনগণের জন্য কোনো সাহিত্যধারা তখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বটতলা অঞ্চলের ছাপাখানাগুলো এই শূন্যস্থান পূরণ করে। সেখানে সস্তা কাগজে কাঠের ব্লকে ছাপা যেসব বই প্রকাশিত হতো, সেগুলোই পরিচিত হয় ‘বটতলার বই’ নামে।
তবে এই বইগুলোকে শুধুই বাণিজ্যিক পণ্যে পর্যবসিত ভাবলে ভুল হবে। এগুলো ছিল একধরনের “লোকপ্রিয় ছাপা সংস্কৃতি”—print popular culture—যা জনগণের মানসিক, ধর্মীয়, নৈতিক ও বিনোদন চাহিদার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত।
বটতলার বইয়ের মূল বিষয় ছিল পৌরাণিক কাহিনি, অলৌকিক ঘটনা, ভূতপ্রেত, যাত্রানির্ভর নাট্যরূপ, রোমান্স, ধর্মীয় উপদেশ, সামাজিক অপরাধ, নারী-নিপীড়নের কাহিনি এবং প্রেম-প্রতারণা। যদিও এগুলোর বেশিরভাগই ‘আখ্যান’ ঘরানার, তবু সেগুলোর ভাষা ও গঠনচিত্রে প্রাচীন মঙ্গলকাব্য ও কাব্যনাট্যের ছায়া বিদ্যমান।
বইগুলিতে ‘ভয়’ ও ‘রহস্য’ উপাদানগুলোর আধিক্য দেখা যায়, যা পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়ক ছিল। অলৌকিকতার ব্যবহার জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাস ও কৌতূহলকে উত্তেজিত করত, আর নারীপ্রধান কাহিনিগুলো নারীর নির্যাতন ও প্রেম-দুঃখের সামাজিক অনুবৃত্তিকে উপজীব্য করত। এগুলোর ভাষা সাধারণত ছন্দময়, কাব্যগুণসম্পন্ন এবং গানের মতো সহজে উচ্চারণযোগ্য হতো।
বটতলার বই এককভাবে শুধু পাঠ্য বস্তু ছিল না; বরং এটি ছিল একটি পারফর্মেটিভ পাঠ–প্রক্রিয়া। বই বিক্রেতারা রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে বইয়ের অংশ পড়ে শুনাতেন, কখনও আবৃত্তি করে, কখনও অভিনয়ের ভঙ্গিতে। ফলে বইটি শুধুমাত্র ক্রেতার ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত হতো না, বরং শ্রোতারাও অংশীদার হতো।
এই চর্চা বোঝায় বটতলার বই একধরনের মৌখিক-ছাপা সংকর সংস্কৃতির প্রতিফলন ছিল। Pierre Bourdieu–র “cultural field” ধারণা অনুযায়ী, এখানে পাঠের ক্ষমতা কেবল উচ্চবর্গীয় একাডেমিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সাধারণ জনগণের মধ্যেও একটি ‘স্বনির্মিত পাঠ-অভিজ্ঞতা’ গড়ে উঠেছিল।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সহ প্রমুখ বুদ্ধিজীবী এই সাহিত্যের ধারাকে ‘অশ্লীল’, ‘বাজে রুচির’ এবং ‘মূর্খ সমাজের সাহিত্য’ হিসেবে তিরস্কার করেন। বাংলা গদ্য ও কাব্যকে ‘ভদ্রলোক সংস্কৃতিতে’ রূপান্তরের এই প্রকল্পের ফলে, বটতলার সাহিত্য তথাকথিত ‘আধুনিকতা’র মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হয়।
এছাড়া ১৮৭৬ সালের “Vernacular Press Act” ও অন্যান্য সেন্সরশিপ আইন বটতলার বইয়ের ওপর কঠোর নজরদারি আরোপ করে। কিছু প্রকাশনী বন্ধ করে দেওয়া হয়, অনেক লেখক ও বিক্রেতা হয়রানির শিকার হন। ফলে ১৯শ শতকের শেষদিকে বটতলার বইয়ের প্রকাশনা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ে।
আজকের দিনে সাহিত্য, ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব ও লিঙ্গ অধ্যয়নের পাঠ্যক্রমে বটতলার বইয়ের গুরুত্ব নতুনভাবে আবিষ্কৃত হচ্ছে। এই বইগুলো উপনিবেশিক বাংলা সমাজের লিঙ্গ রাজনীতি, ধর্মীয় প্রতীক, যৌনতার চর্চা, শ্রেণি বিভাজন এবং পাঠ সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বটতলার ‘নারী-আখ্যান’গুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় কিভাবে নারীশরীরকে কখনও পূজা, আবার কখনও ভয়ের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে যা ঔপনিবেশিক পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির দিক নির্দেশ করে। এছাড়াও,এই বইগুলো উপনিবেশিক বাংলার “popular unconscious”—অর্থাৎ অবচেতন সাংস্কৃতিক চেতনার একটি শক্তিশালী দলিল হিসেবে দেখা যায়।
বটতলার বই কোনো সাহিত্যিক ব্যতিক্রম নয় বরং এটি ছিল বাংলার প্রথম গণসাহিত্য আন্দোলন—যেখানে পাঠ ছিল সহজলভ্য, আকর্ষণীয় এবং সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। উচ্চবর্গের আধুনিকতা বটতলার সাহিত্যের স্বীকৃতিকে দমিয়ে দিলেও আজকের পাঠপ্রবণ সমাজ ও গবেষণামুখী পরিবেশ এই ধারাকে পুনরুদ্ধার করছে।


