ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক নেতৃত্ব কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে, যার ফলে এক দুর্বল তেহরানের প্রতিশোধ নেওয়ার বিকল্প খুবই সীমিত হয়ে পড়েছে — যার মধ্যে রয়েছে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ, যা ইরান প্রস্তুত নয় এবং জেতার সম্ভাবনাও কম, এমনটাই রয়টার্সকে জানিয়েছেন চারজন আঞ্চলিক কর্মকর্তা।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা সূত্রগুলো বলছে, তেহরান সম্ভবত একই ধরনের কার্যকর হামলা চালাতে পারবে না, কারণ হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধের সময় থেকে ইসরায়েল তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক সামরিক নেটওয়ার্ক ব্যাপকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে।
এই সূত্রগুলো বলছে, ইরানের নেতারা এখন পর্যুদস্ত এবং নিজেদের টিকে থাকার দুশ্চিন্তায় ব্যস্ত। ইসরায়েলি সামরিক চাপের মুখে নিজেদের দুর্বলতা স্বীকার করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এর ফলে আরও উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে — যার মধ্যে রয়েছে ইসরাইলের বিরুদ্ধে গোপন সন্ত্রাসবাদী হামলা কিংবা আরও বিপজ্জনক পথ, যেমন দ্রুত পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা।
গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনে হুতি এবং ইরাকে মিলিশিয়াদের ওপর ইসরায়েলি হামলা এবং ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র, সিরিয়ার স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদকে হটিয়ে দেওয়ার ফলে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব দুর্বল হয়ে গেছে।
এছাড়া, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের তেল রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশের অর্থনীতি চরম সংকটে পড়েছে — মুদ্রার দরপতন, অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও পানির ঘাটতির মতো একাধিক সমস্যা দেখা দিয়েছে।
গালফ রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক আবদেলআজিজ আল-সাগের বলেন, ইরান এখন কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে এবং তাদের সামনে বিকল্প খুব কম। একটি সম্ভাব্য বিকল্প হতে পারে — গোপনে আশ্বাস দেওয়া যে তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পারমাণবিক কার্যক্রম পরিত্যাগ করবে, কারণ জনসমক্ষে এমন ঘোষণা দিলে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে।
তিনি বলেন, আরেকটি বিকল্প হতে পারে সন্ত্রাসী হামলার পথে ফিরে যাওয়া — ১৯৮০’র দশকের আমেরিকান ও ইসরায়েলি দূতাবাস ও সামরিক স্থাপনায় বোমা হামলার মতো। তৃতীয় এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক বিকল্পটি হলো — পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (NPT) থেকে বেরিয়ে গিয়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ত্বরান্বিত করা।
এ ধরণের পদক্ষেপ যুদ্ধ ঘোষণা বলেই গণ্য হবে এবং এতে কেবল ইসরায়েল নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা শক্তিও কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাবে বলে সতর্ক করেছেন আল-সাগের। একজন উচ্চপদস্থ আঞ্চলিক কর্মকর্তা, যিনি ইরানি প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ, বলেন শুক্রবারের হামলাগুলো কেবল কৌশলগত ক্ষতি নয়, বরং ইরানের নেতৃত্বের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে।
তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন অভিজাত শ্রেণির মধ্যে এখন আত্মবিশ্বাসের জায়গায় উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। পর্দার আড়ালে উদ্বেগ বাড়ছে কেবল বাইরের হুমকি নয়, বরং দেশের অভ্যন্তরেও তাদের নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা থেকে। “নেতৃত্বের মধ্যে আতঙ্ক বেড়ে গেছে,” বলেন ওই আঞ্চলিক কর্মকর্তা। “বাইরের হামলার ভয় ছাড়াও তাদের সবচেয়ে বড় ভয় — দেশীয় বিদ্রোহ।”
যদি দেশজুড়ে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে এবং সরকার দমন-পীড়নের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তবে তা তাদের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে — কারণ জনগণের ক্ষোভ দীর্ঘদিন ধরে জমে আছে, যার পেছনে রয়েছে পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, মূল্যস্ফীতি এবং মতপ্রকাশের দমন।
হামলার পর এক ভিডিও ভাষণে নেতানিয়াহু ইরানে সরকার পরিবর্তনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং ইরানিদের উদ্দেশে বার্তা দেন। বিশ্লেষকদের মতে, সরকার পরিবর্তনের এই আশা থেকেই ইসরায়েল এত বেশি সংখ্যক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার ওপর হামলা চালিয়েছে, যার ফলে ইরানের নিরাপত্তা কাঠামো ভেঙে পড়েছে এবং ‘অপরাজেয়’ ভাবমূর্তির প্রতি সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্লেষকরা আরও বলেন, এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ট্রাম্প আবার ইরানকে পারমাণবিক আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে পারেন — তবে এবার ইরান আরও নিঃসঙ্গ অবস্থায় থাকবে এবং বেশি ছাড় দিতে বাধ্য হতে পারে।
মাঝারি পর্যায়ের একজন প্রাক্তন ইরানি কর্মকর্তা বলেন, ২০২০ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের বিপ্লবী গার্ডের বিদেশি শাখার প্রধান জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করার ঘটনাই ইরানের দুর্বলতার সূচনা করেছিল। তারপর থেকেই ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটি আঞ্চলিক প্রভাব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেও সফল হয়নি। তিনি বলেন, “এই হামলা হয়তো তাদের পতনের শুরু হতে পারে।”


