১৬শ শতকের ইউরোপে যখন ধর্মীয় সংস্কারের উত্তাল বাতাস বইছিলো। তখনকার শাসকগোষ্ঠী এবং প্রচলিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল এক নতুন ধরনের ধর্মীয় সম্প্রদায় — আনাব্যাপটিস্টরা। তারা সাধারণ প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কারকদের থেকেও বেশি মৌলবাদী, স্বাধীনতাপ্রিয় এবং সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে অভূতপূর্ব প্রতিবাদী ছিল। আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের আন্দোলনকে দেখা হয়েছিল এক ধরনের অদ্ভুত মনোভাবের প্রতিফলন হিসেবে, যাদের কারণে ধর্ম ও রাজনীতির জটিল সংঘাতের নেপথ্যে লুকিয়ে ছিল আরও গভীর প্রশ্ন।
“আনাব্যাপটিস্ট” শব্দের অর্থ হলো “পুনরায় ব্যাপটিজম দেওয়া”। কিন্তু এই নামের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে গভীর বিশ্বাসের ধারনা। আনাব্যাপটিস্টরা বিশ্বাস করতেন, শিশুকালে দেওয়া বাপ্তিস্ম কোনো অর্থবহ ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা বহন করে না। কারণ শিশুরা তখন নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বচ্ছ ও পরিণত স্বীকারোক্তি দিতে সক্ষম নয়। তাই প্রকৃত বিশ্বাসী হওয়ার জন্য প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে তার ইচ্ছা এবং বিশ্বাসের প্রকাশের ভিত্তিতে বাপ্তিস্ম দিতে হবে। এটাই ছিল তাদের আন্দোলনের মূল ভিত্তি।
আনাব্যাপটিস্ট আন্দোলনের উৎপত্তি ঘটে ১৬শ শতকের ইউরোপে, একে বলা হয় র্যাডিক্যাল রিফরমেশন। এটি ছিল প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কারের একটি ধারাবাহিক কিন্তু আরো গভীর ও কঠোর পর্যায়, যা প্রচলিত ধর্মীয় প্রথা ও প্রতিষ্ঠানকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল।
সুইজারল্যান্ডের জুরিখ শহর ছিল এই আন্দোলনের প্রথম কেন্দ্রে। উলরিখ্ জুইংলি (Ulrich Zwingli) ছিলেন সেই সময়ের প্রভাবশালী সংস্কারক, যিনি প্রচলিত ক্যাথলিক প্রথার বিরুদ্ধে সংস্কারমূলক কাজ শুরু করেন। তার ছাত্র ও অনুসারীরা, বিশেষ করে ১৫২৫ সালে প্রথমবারের মতো “পুনরায় বাপ্তিস্ম” দেওয়ার উদ্যোগ নেন। এই ঘটনাই আনাব্যাপটিস্ট ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।
আনাব্যাপটিস্টরা বাইবেলের শিক্ষাকে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব বলে মেনে নিতো। তাদের বিশ্বাস ছিল ধর্মীয় জীবন হতে হবে ব্যক্তি কেন্দ্রিক এবং সম্পূর্ণ স্বাধীন। এজন্য তারা শিশুবাপ্তিস্মকে বাতিল করে শুধুমাত্র সেই ব্যক্তিরই বাপ্তিস্ম গ্রহণের পক্ষপাতী, যিনি তার বিশ্বাস প্রকাশে পরিপক্ক।
তাদের ধর্মচর্চায় ছিল কিছু উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিলো। আনাব্যাপটিস্টরা শপথ গ্রহণের বিরুদ্ধে ছিলেন কারণ তারা বিশ্বাস করতেন, সৎ মানুষের কথা সবসময় সত্যই হয়; অতএব আলাদা করে শপথের প্রয়োজন নেই। তারা যুদ্ধ, সামরিক বাহিনীতে যোগদান বা রাজনীতি থেকে দূরে থাকতেন। কারণ তাদের মতে খ্রিস্টান হওয়ার মানে হলো শান্তির পথ অনুসরণ করা এবং জোরজবরদস্তি পরিহার করা। অনেক আনাব্যাপটিস্ট সম্প্রদায় একে অপরের প্রতি গভীর সহানুভূতি, সাহায্য ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী ছিলেন।
আনাব্যাপটিস্টদের বিশ্বাস ও চর্চা ছিল সেই সময়ের প্রচলিত ধর্ম ও রাজনীতির জন্য বিপজ্জনক। তাদের শপথবিরোধী মনোভাব, শিশুবাপ্তিস্মের নাকচ এবং সামরিক অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকার কারণে তারা দুই পাশের ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিশপ্ত হয়ে যায়।
তাদের ওপর যেভাবে নির্যাতন চালানো হয়, তা ইতিহাসে অত্যন্ত নির্মম ও হৃদয়বিদারক। অনেক আনাব্যাপটিস্টকে ডুবিয়ে মারা হয়, কাউকে কাউকে জ্বালিয়ে মারা হয়। তাদের বিরুদ্ধে এই নিষ্ঠুরতা ছিল ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও রাষ্ট্রক্ষমতার এক অমানবিক ছত্রছায়া।
এই ভয়াবহ নির্যাতনের কারণে আনাব্যাপটিস্টরা ইউরোপ থেকে পালিয়ে নতুন দিগন্ত খুঁজতে আমেরিকায় স্থানান্তরিত হন। সেখানে তাদের সম্প্রদায় নতুন করে গড়ে ওঠে এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করে।
আনাব্যাপটিস্টদের সরাসরি উত্তরসূরিরা হলেন আমিশ, মেনোনাইট, এবং হাটারাইট সম্প্রদায়। তারা একই আদর্শে বিশ্বাসী, ব্যক্তিগত বিশ্বাস, শান্তি, সামাজিক ন্যায়, এবং রাজনীতির প্রতি নির্লিপ্ততা। তাদের জীবনযাপন অনেকাংশে ঐতিহ্যবাহী, প্রাকৃতিক ও আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক। তারা আধুনিক বিশ্ব থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রেখেও নিজেদের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
আনাব্যাপটিস্টরা ছিলেন সেই অদ্ভুত অন্য যারা তাদের সময়ের ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে উচ্চস্বরে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তাদের বিশ্বাস ছিল “বন্দী ধর্ম” বা আবদ্ধ বিশ্বাসের পরিবর্তে মুক্তি ও স্বাধীনতার।
তারা নিজেদের জীবনকে একটি সংগ্রামের মাঠ বানিয়েছিলেন যেখানে ব্যক্তিগত ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা একে অপরের পরিপূরক ছিল। এই কারণে তাদের ইতিহাস শুধু ধর্মীয় সংস্কারের ইতিহাস নয়, বরং মানবাধিকারের ইতিহাসেরও এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।


