চীন থেকে আসা রেয়ার-আর্থ ম্যাগনেটের আসন্ন ঘাটতি নিয়ে বিশ্বব্যাপী গাড়ি প্রস্তুতকারকরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। ধারণা করা হচ্ছে, এই ঘাটতি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই গাড়ির কারখানাগুলো বন্ধ করে দিতে পারে।
রয়টার্স জানিয়েছে, সর্বশেষ গত মঙ্গলবার জার্মান গাড়ি নির্মাতা কোম্পানিগুলো অভিযোগ করেছে যে — চীন থেকে বিরল খনিজের মিশ্রণ, মিশ্র ধাতু ও চুম্বকের রপ্তানিতে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা দ্রুত প্রত্যাহার না হলে উৎপাদনে বিলম্ব ও বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক চীনা পণ্যে উচ্চ শুল্ক আরোপের পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে চীন এপ্রিল মাসে বিভিন্ন ধরনের বিরল খনিজ এবং সংশ্লিষ্ট চুম্বকের রপ্তানি স্থগিত করে। ফলে বিশ্বব্যাপী গাড়ি নির্মাতা, মহাকাশ প্রযুক্তি সংস্থা, সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানি ও সামরিক যন্ত্রপাতি উৎপাদকের জন্য অপরিহার্য কাঁচামালের সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হয়েছে।
এপ্রিল মাসে চীন থেকে বিরল খনিজ চুম্বকের রপ্তানি অর্ধেকে নেমে আসে। এই পদক্ষেপটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য যুদ্ধে চীনের একটি কৌশলগত চাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এপ্রিলে দুই দেশ যখন জেনেভায় এক ধরনের বাণিজ্য সমঝোতায় পৌঁছায়, তখন ধারণা ছিল চীন বিরল খনিজ পদার্থ রফতানি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করবে। কিন্তু মে মাসে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, চীন সমঝোতা ভঙ্গ করে সাতটি বিরল খনিজের রফতানিতে আগের মতোই কড়াকড়ি রাখছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট মঙ্গলবার সাংবাদিকদের জানান, ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই সপ্তাহে কথা বলবেন বলে আশা করা হচ্ছে এবং এই রপ্তানি নিষেধাজ্ঞাগুলো আলোচ্য বিষয়ের শীর্ষে থাকবে।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম গত সপ্তাহে জানায়, ইউরোপীয় সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলোর জন্য এই নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করার কথা বিবেচনা করছে বেইজিং। এদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ইস্যুতে অন্যান্য দেশের সঙ্গে সহযোগিতা আরও জোরদার করবে।
গাড়ি, ড্রোন, রোবট, ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি তৈরিতে অত্যাবশ্যক বিরল খনিজ চুম্বক রপ্তানির ওপর চীনের নিষেধাজ্ঞা টোকিও থেকে ওয়াশিংটন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের রাজধানীতে ও কর্পোরেট সদরদপ্তরে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। কর্মকর্তারা একদিকে চীনের সাথে দেন-দরবার শুরু করেছেন, অন্যদিকে বিকল্প সরবরাহের সীমিত উৎস খুঁজে পেতে হন্যে হয়ে উঠেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধে বিরল খনিজ হয়ে উঠেছে নতুন উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য মতে, বিশ্বের ৬১ শতাংশ বিরল খনিজ চীন থেকে খনন হয়, আর প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে চীনের নিয়ন্ত্রণ ৯২ শতাংশ পর্যন্ত।
বিরল খনিজ নামে পরিচিত ১৭টি ধাতব উপাদান, এদের মধ্যে স্ক্যান্ডিয়াম, ইট্রিয়াম ও লান্থানাইড সবচেয়ে প্রয়োজনীয়। এগুলো মূলত ব্যবহৃত হয় স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি, উইন্ড টারবাইন, এলইডি লাইট, ফ্ল্যাট-স্ক্রিন টিভি, এমনকি চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও ক্যানসার চিকিৎসায়। কিন্তু এ উপাদানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার সম্ভবত সামরিক খাতে। যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান, সাবমেরিন, স্যাটেলাইট, লেজার অস্ত্র কিংবা টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র—সবখানেই এই খনিজ অপরিহার্য।
বিরল নামে পরিচিত হলেও এই উপাদান পৃথিবীর অনেক অংশেই পাওয়া যায়—এমনকি সোনার থেকেও বেশি পরিমাণে। তবে সমস্যা হলো, এগুলো খুঁজে বের করা, আলাদা করা ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে প্রক্রিয়াজাত করা অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল।
সিএনএন জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি মাত্র খনি রয়েছে যা বিরল খনিজ উত্তোলন করে। কিন্তু উত্তোলনের পর ভারী উপাদানগুলো এখনো প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের নেই বললেই চলে। তাই প্রক্রিয়াজাত করতে আগে এসব চীনেই পাঠানো হতো।
চীনের এই রফতানি নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধাক্কা। ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিরল খনিজের ৭০ শতাংশই এসেছে চীন থেকে। সংকট সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র এখন নতুন উৎসের খোঁজে নজর দিয়েছে ইউক্রেন, গ্রীনল্যান্ড ও সৌদি আরবের দিকে। কিন্তু ইউক্রেনে খনিজ খাত এখনো অপরিণত, এমনকি কোথায় কী পরিমাণ খনিজ পাওয়া যাবে, সে মানচিত্রও এখনো পরিষ্কার নয়।


