শিক্ষা একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হতে চাইলে একটি দেশের সর্বাগ্রে প্রয়োজন শিক্ষার মানোন্নয়ন ও গবেষণার বিস্তার। উন্নত বিশ্বে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার বিকাশের মাধ্যমে জ্ঞানভাণ্ডার যেমন সমৃদ্ধ হয়েছে, তেমনি তারা বিশ্বমঞ্চে সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছেছে। কিন্তু বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা খাত বরাবরই নানা সংকট ও অনিয়মের শিকার, যার মূল কারণ রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অদক্ষতা।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় নানান সংস্কার এলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলোর লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন। প্রতিটি সরকার তাদের আদর্শ অনুযায়ী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছে, যার ফলে পাঠ্যক্রমে বারবার পরিবর্তন এসেছে। এতে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য, একটি মুক্তচিন্তার, সচেতন ও মানবিক প্রজন্ম তৈরিতে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পাঠ্যক্রমে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির আধিপত্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংকীর্ণ মানসিকতা সৃষ্টি করছে।
শুধু পাঠ্যক্রম নয়, শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাতেও রাজনৈতিক প্রভাব সুস্পষ্ট। অনেক সময় যোগ্যতা ও মেধার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যই নিয়োগের প্রধান বিবেচ্য হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অনেকে যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক ও একাডেমিক পদে আসীন হন, যা উচ্চশিক্ষার গুণগত মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রত্যাশা ছিল, উচ্চশিক্ষা খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যায়নি।টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অস্থিরতা আজও অব্যাহত। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকড় গভীরভাবে প্রোথিত। এর ফলে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞানার্জন ব্যাহত হচ্ছে এবং শিক্ষা ব্যয় অযথা বেড়ে যাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক সমাজের মধ্যেও রাজনৈতিক বিভাজন প্রকট। শিক্ষক নিয়োগে দলীয় পদ-পদবি, আঞ্চলিক পক্ষপাতিত্ব এবং গোষ্ঠীগত আনুগত্যকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। যার ফলে গবেষণা, জ্ঞানচর্চা ও একাডেমিক উৎকর্ষতা উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য ও শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পদত্যাগে বাধ্য হন, যা প্রমাণ করে এসব নিয়োগ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত। যদি এসব ব্যক্তির যথেষ্ট একাডেমিক অবদান থাকত, তবে তাদের এত রাজনীতির সময় হতো না।
ছাত্ররাজনীতি বর্তমানে আর আদর্শ ভিত্তিক নয়; বরং তা চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও সহিংসতার রূপ নিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাবের বলয়ে বন্দি। যার ফলে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, এবং ক্যাম্পাসজুড়ে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা ও ভয়ের পরিবেশ।
এই সংকট নিরসনে সরকারের কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশাসনিক পদে মেধা, গবেষণা ও একাডেমিক পারফরম্যান্সকে মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। শুধু আইন তৈরি করলেই হবে না, সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগও দরকার। তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, শিক্ষাখাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার জন্য একটি সর্বাত্মক রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রয়োজন। সরকারের শীর্ষপর্যায় থেকে যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট বার্তা না আসে এবং তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন না হয়, তবে এ খাতে কোনো স্থায়ী পরিবর্তন আশা করা যাবে না।উচ্চশিক্ষা খাতের দুর্নীতি ও অনিয়ম শুধু আর্থিক অপচয় নয়; এটি জাতির ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করছে। যদি শিক্ষার্থীরা এমন একটি পরিবেশে বেড়ে ওঠে যেখানে অনিয়ম ও দুর্নীতি স্বাভাবিক ঘটনা, তাহলে তারা ভবিষ্যতে এসব অপসংস্কৃতি মেনেই সমাজে প্রবেশ করবে। এটি একটি জাতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
অতএব, শিক্ষা খাতে দুর্নীতি, অনিয়ম ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ রোধ করে একটি স্বচ্ছ, নৈতিক ও মানসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। এই লক্ষ্য অর্জনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও জনসচেতনতার সমন্বয় একান্ত প্রয়োজন।


