সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) এক গবেষণায় দেখা যায়, গত বছর অক্টোবর থেকে ঢাকা এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় চিকুনগুনিয়া রোগের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়।
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বলছেন, বাংলাদেশে চিকুনগুনিয়ার বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা আছে নিকট ভবিষ্যতে। এর একাধিক কারণও আছে।সেগুলোর মধ্যে আছে দীর্ঘদিন ধরে এ অসুখ না থাকায় এ ভাইরাসের ‘খোলা মাঠ’, এডিস অ্যালবোপিকটাসের বিস্তৃতি এবং দেশে এর মোকাবিলায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকা।
দীর্ঘ সময় ধরে এ রোগের প্রতিক্রিয়া থাকায় বিপুল পরিমাণে আর্থিক ক্ষতিও হতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া হাত ধরাধরি করে আসে। এখন পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আগের যেকোনো বছরের চেয়ে বেশি। এর নিয়ন্ত্রণে এখন পর্যন্ত সরকারি যথেষ্ট তৎপরতাও দেখা যাচ্ছে না। এ–সংক্রান্ত গবেষণা বিজ্ঞানভিত্তিক সাময়িকী সায়েন্স ডিরেক্টে প্রকাশিত হয়।
চিকুনগুনিয়া ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশাবাহিত রোগ। এ রোগে ডেঙ্গুর মতোই জ্বর আসে। বাড়তি উপসর্গ হলো, শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। চিকুনগুনিয়ায় মৃত্যুর ঘটনা তেমন না থাকলেও এর ফলে হওয়া ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হয়।
বাংলাদেশে ২০১৭ সালে চিকুনগুনিয়া ভাইরাসের বড় প্রাদুর্ভাব হয়। এরপর এই ভাইরাস প্রায় অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। ২০২৪ সালের শেষের দিকে আবার ফিরে আসে।
গবেষণায় বলা হয়, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত সন্দেহজনক ৩৯৪ ব্যক্তিকে পরীক্ষা করে ১৩৮ বা ৩৫ শতাংশ ব্যক্তির দেহে চিকুনগুনিয়া ভাইরাস শনাক্ত করা হয়।
চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ২৮ দিন পরও ৮১ শতাংশ রোগীর কমপক্ষে একটা লক্ষণ রয়ে গেছে। সবচেয়ে সাধারণ যে লক্ষণটি দেখা গেছে, তা হলো শরীরের বিভিন্ন গাঁটে ব্যথা।
গবেষণায় দেখা গেছে, গত বছর আক্রান্ত হওয়া রোগীদের গড়ে সাড়ে ১০ কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশের জনপ্রতি প্রতিদিন গড় আয় ৬ দশমিক ৯৮ ডলার হিসাব করে রোগীপ্রতি মোট কর্মঘণ্টা হয় ৭৩ দশমিক ৩ ডলার বা ৮ হাজার ৮৭০ টাকার মতো।
২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত (করোনাসহ) ডেঙ্গুর দিকেই দৃষ্টি ছিল বেশি। এর মধ্যে ২০২৩ সালে দেশের ইতিহাসে ডেঙ্গুর সবচেয়ে বেশি প্রাদুর্ভাব হয়। ডেঙ্গু ভাইরাসের বেশ কয়েকটা বড় প্রাদুর্ভাব হওয়ার পর অনেক মানুষের শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাসের সেরোটাইপ–২ ও ৩–এর বিরুদ্ধে একধরনের ইমিউনিটি তৈরি হয়েছে। তাই এখন ডেঙ্গুর প্রকোপ অপেক্ষাকৃত কম হতে পারে বলে মনে করেন এ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত যুক্তরাজ্যের কেইল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক নাজমুল হায়দার।
তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের বিরাট একটা জনগোষ্ঠীর শরীরে চিকুনগুনিয়ার অ্যান্টিবডি নেই, তাই চিকুনগুনিয়ার বিস্তার অনেক সহজ হবে।সুতরাং আগামী দুই বছর বাংলাদেশে ডেঙ্গুর পরিবর্তে চিকুনগুনিয়া ভাইরাসের রাজত্ব চলার আশঙ্কা আছে।
ব্রাজিল, আর্জেন্টিনাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলতি বছর চিকুনগুনিয়া ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতির জটিলতায় গত এপ্রিলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) একটি সভা করে। এ বছর দক্ষিণ আমেরিকা ও ভারত মহাসাগরীয় বিভিন্ন দেশের চিকুনগুনিয়ার ব্যাপক প্রাদুর্ভাবের কথা বলা হয় সভায়।যেহেতু বৈশ্বিক যোগাযোগব্যবস্থা এখন খুব উন্নত, তাই বাংলাদেশের মতো দেশে এর বড় সংক্রমণ ঘটা অস্বাভাবিক নয়। যেহেতু এডিস মশার বিস্তার এখনো যথেষ্ট ঘটছে। গতকাল বুধবার পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ২৪০ জন। গত বছরের এ সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৭৯৫ জন।


