ঢাকা ও সাভারের পানির উৎসে ডায়রিয়ার সুপারবাগ জীবাণুর উপস্থিতি নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজির গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এই সুপারবাগগুলি এমন ব্যাকটেরিয়া, যেগুলোর ওপর অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ কার্যকর হয় না, ফলে এই জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হলে চিকিৎসা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
সুপারবাগ বলতে বোঝায় এমন ব্যাকটেরিয়া যেগুলো অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। অর্থাৎ যেসব ব্যাকটেরিয়ার ওপর প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ কাজ করে না, তাদেরকে সুপারবাগ বলা হয়। এই জীবাণুগুলো দেহে প্রবেশ করলে রোগ হয়, কিন্তু চিকিৎসায় সেগুলো ভালো হয় না বা খুব কঠিন হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সতর্ক করেছে যে ২০৫০ সালের মধ্যে সুপারবাগের কারণে বছরে প্রায় ১০ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হতে পারে, যা বর্তমানের তুলনায় অত্যন্ত ভয়াবহ পরিস্থিতি নির্দেশ করে।
গত তিন বছর ধরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শুভ্র কান্তি দে, সহকারী অধ্যাপক নাদিম শরীফ ও তাঁদের গবেষক দল ঢাকা ও আশেপাশের পানির উৎস থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছেন। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা ও সাভারের ৮টি পানির উৎসে ডায়রিয়ার সুপারবাগ জীবাণু বিদ্যমান, যা ডায়রিয়ার মতো রোগের চিকিৎসাকে কঠিন করে তোলে। এই গবেষণাটি বিশ্ববিখ্যাত নেচার পাবলিশিং গ্রুপের ‘এনপিজে ক্লিন ওয়াটার’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে, যা গবেষণার গুণগত মানের প্রমাণ।
বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ও অতিরিক্ত ব্যবহার সুপারবাগ বৃদ্ধির প্রধান কারণ। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না থাকায়, যেমন বিনা প্রেসক্রিপশনে ওষুধ গ্রহণ, পুরো কোর্স শেষ না করা, অপ্রয়োজনীয় ডোজ ব্যবহার এবং ভাইরাসজনিত রোগে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন, এগুলো ব্যাকটেরিয়ার অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন বাংলাদেশে হাসপাতালগুলো জীবাণুর প্রধান আবাসস্থল হয়ে উঠেছে। জনাকীর্ণ হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ দ্রুত ছড়ায় এবং রোগীদের অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার প্রবণতা এই সমস্যা বাড়িয়ে তোলে। এছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের তথ্যের অভাব ও নিয়ন্ত্রণের অভাবও রেজিস্ট্যান্স বৃদ্ধির কারণ।
সুপারবাগের কারণে চিকিৎসা ব্যর্থ হওয়ার ফলে রোগীরা দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতা ভোগ করে এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়। বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে এমন জীবাণুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে যা সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী, অর্থাৎ কোনো অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে সেগুলো নির্মূল করা সম্ভব নয়। এই ধরনের মাল্টি ড্রাগ, এক্সটেনসিভ ড্রাগ ও প্যান ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু রোগীদের জন্য মারাত্মক হুমকি।
বিশ্বব্যাপী অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের বিরুদ্ধে লড়াই চলছে। এর জন্য অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের অতিরিক্ত ও ভুল ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। পোলট্রি, মৎস্য খামার, কৃষি ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি।
ব্যক্তিগত পর্যায়েও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ এড়াতে হবে, সম্পূর্ণ ডোজ শেষ করতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকতে হবে। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে জীবাণু নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।
ঢাকা ও সাভারের পানির উৎসে ডায়রিয়ার সুপারবাগ জীবাণুর উপস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি। এটি চিকিৎসার জটিলতা বাড়িয়ে রোগীদের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে। সুপারবাগের বিস্তার রোধে অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উন্নতি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। না হলে ২০৫০ সালের মধ্যে সুপারবাগের কারণে বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটার আশঙ্কা রয়েছে, যা বাংলাদেশের মতো দেশে আরও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।


