উত্তর-পশ্চিম ইউরোপসহ গোটা মহাদেশে চলতি বছর শতাব্দীর সবচেয়ে শুষ্ক বসন্ত দেখা দিয়েছে। এই ভয়াবহ খরার ফলে ইউরোপের কৃষকরা মারাত্মক সংকটে পড়েছেন, যার প্রভাব পড়ছে ফসল উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায়। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে জার্মানিতে ইতিহাসের সবচেয়ে শুষ্ক মার্চ রেকর্ড করা হয়েছে। রাইন নদীর পানিস্তর স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় অর্ধেক নেমে এসেছে। গোটা ইউরোপে গড় বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় এবং তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকায় নদী ও জলাধারের পানি দ্রুত কমছে। এপ্রিলের রিপোর্ট অনুযায়ী, উত্তর ও পশ্চিম ইউরোপে আগামী জুন পর্যন্ত স্বাভাবিকের চেয়ে শুষ্ক আবহাওয়া বজায় থাকবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা কৃষি, নদীপথ পরিবহন এবং পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।
খরার কারণে মাটিতে আর্দ্রতার ঘাটতি দেখা দিয়েছে, ফলে ফসলের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রায় ৪৬% এলাকা খরার সতর্ক অবস্থায় রয়েছে এবং ১১% এলাকা উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। ফ্রান্স, রোমানিয়া, হাঙ্গেরি, ইতালি, স্পেনসহ দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। অনেক স্থানে গম, ভুট্টা, রাইসহ প্রধান ফসলের উৎপাদন ৩০-৫০% পর্যন্ত কমে গেছে।
খরার কারণে পশুখাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে, ফলে অনেক ডেইরি খামারিকে গবাদিপশু জবাই করতে বাধ্য হতে হয়েছে। খাদ্যশস্যের দাম কয়েকগুণ বেড়ে গেছে, যা কৃষকদের জন্য আরও চাপের সৃষ্টি করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৃষি খাত প্রতি বছর গড়পড়তায় ২৮.৩ বিলিয়ন ইউরো ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, যা মোট কৃষি ও পশুপালন উৎপাদনের প্রায় ৬%। এই ক্ষতির মাত্র ২০-৩০% বিমার আওতায় থাকলেও বাকি অংশ সম্পূর্ণ অনিরাপদ রয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ২০৫০ সালের মধ্যে কৃষকদের বার্ষিক ফসল ক্ষতির পরিমাণ ৬৬% পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলোতে খরার কারণে বছরে ২০ বিলিয়ন ইউরো পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে।
ইউরোপীয় কমিশন কৃষকদের জন্য জরুরি সহায়তা, বিমা সুবিধা এবং পরিবেশগত নিয়ম শিথিলের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে কৃষকরা বলছেন, এই উদ্যোগগুলো যথেষ্ট নয়; আরও দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। শতাব্দীর সবচেয়ে শুষ্ক বসন্ত ইউরোপের কৃষি ও অর্থনীতিতে গভীর সংকট তৈরি করেছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে, যা শুধু ইউরোপ নয়, গোটা বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।


