কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে আমাদের ভাবনা দ্বিধা ও দ্বন্দ্বে পূর্ণ। আমরা কি এআই-র মাধ্যমে এক নতুন যুগের মুক্তির দ্বার উন্মোচন করেছি, নাকি নিজেরাই ডেকে এনেছি সমাজের পতন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা বারবার একটি গভীর বৈপরীত্যের মুখোমুখি হই-এআই-র বাহ্যিক চমকপ্রদ ফলাফল আমাদের মুগ্ধ করলেও, এর অন্তর্নিহিত প্রক্রিয়া বা ‘কিভাবে’ অংশটি নিয়ে আমরা হতাশ বা উদ্বিগ্ন হই।
জেনারেটিভ এআই বিশেষত বড় ভাষা মডেল (LLM) যেমন ChatGPT, আমাদের সামনে মানুষের মতো ভাষা ও শিল্পকর্ম উপস্থাপন করে। এসব দেখে আমরা মুগ্ধ, কিন্তু এগুলোর মধ্যে মানবিক অর্থ, নৈতিকতা কিংবা মৌলিকতা কতটা আছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অনেক সময় এআই-র শিল্পকর্মে দেখা যায়, আগের শিল্পীদের কাজ অনুকরণ বা চুরি করা হচ্ছে, যা নৈতিক ও আইনগত প্রশ্ন তোলে।
এই অনুকরণ প্রবণতা আসলে নতুন কিছু নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সূচনালগ্ন থেকেই অনুকরণ ছিল এর মূল চালিকাশক্তি। এআই-র ইতিহাস ও দর্শনের গভীরে গেলে দেখা যায়, অনুকরণকেই বুদ্ধিমত্তার মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যা আজকের জেনারেটিভ এআই-র সংকটের মূলেও রয়েছে।
এআই-র জনক অ্যালান ট্যুরিং ১৯৫০ সালে ‘Computing Machinery and Intelligence’ প্রবন্ধে ‘অনুকরণ খেলা’ (imitation game) ধারণা দেন। পরে এটি ‘ট্যুরিং টেস্ট’ নামে পরিচিতি পায়। ট্যুরিং-এর প্রশ্ন ছিল, “মেশিন কি চিন্তা করতে পারে?” কিন্তু তিনি নিজেই স্বীকার করেন, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাই তিনি প্রশ্নটি বদলে দেন-“একটি মেশিন কি মানুষের মতো আচরণ করতে পারে, যাতে একজন মানুষ বিভ্রান্ত হয়?”
কিন্তু ট্যুরিং নিজে কখনোই বলেননি, এই অনুকরণ খেলা বুদ্ধিমত্তা যাচাইয়ের চূড়ান্ত মাপকাঠি। বরং এআই গবেষকরা এই টেস্টকেই বুদ্ধিমত্তার মানদণ্ড হিসেবে ধরে নেন এবং এই ভুল ব্যাখ্যা এআই-র ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলে। ২০২৩ সালেও, বিশ্বনেতারা ট্যুরিং-এর কর্মস্থল ব্লেচলি পার্কে এআই নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করেন, যেখানে এই টেস্টের গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবার আহ্বান ওঠে।
১৯৫৬ সালে ডার্টমাউথ কলেজে জন ম্যাকার্থি ও অন্যান্যরা একটি কর্মশালার আয়োজন করেন, যা এআই-র জন্মঘটনা হিসেবে পরিচিত। এখানে মূলত গণিতবিদ ও প্রকৌশলীরা নেতৃত্ব দেন; দর্শন, ভাষাতত্ত্ব কিংবা স্নায়ুবিজ্ঞানীদের অংশগ্রহণ ছিল খুবই সীমিত। ফলে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রকল্পটি হয়ে ওঠে একেবারে প্রকৌশল ও গাণিতিক ভিত্তিক, যেখানে লক্ষ্য ছিল কিভাবে মেশিনকে মানুষের মতো আচরণ করানো যায়।
এই ওয়ার্কশপের ফলাফল ছিল প্রতীক-ভিত্তিক এআই (symbolic AI)-এর উত্থান। এখানে মূলত গাণিতিক প্রতীক ও নিয়মভিত্তিক প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে বুদ্ধিমত্তা অনুকরণের চেষ্টা করা হয়। এর ফলে সামাজিক বিজ্ঞান ও মানবিক শাখাগুলো এআই উন্নয়ন থেকে ক্রমশ দূরে সরে যায়।
এআই-র এই অনুকরণবাদী ধারা পশ্চিমা দর্শনের দীর্ঘ ইতিহাসের ফল। রেনে ডেকার্টেস ‘I think, therefore I am’ উক্তির মাধ্যমে চিন্তার স্থানকে শরীর থেকে আলাদা করেন, আর থমাস হবস ‘reason … is nothing but reckoning’ বলে চিন্তাকে গাণিতিক গণনার সঙ্গে তুলনা করেন। এই দুই দর্শনের সংমিশ্রণেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কেবল গাণিতিক বা প্রকৌশল প্রকল্প হিসেবে কল্পনা করা সহজ হয়।
তবে বিমান বা গাড়ির মতো প্রকৌশল প্রকল্পে সফলতার পরিমাপ সহজ-কত উঁচুতে, কত দ্রুত, কতক্ষণ চলতে পারে তা মাপা যায়। কিন্তু ‘বুদ্ধিমত্তা’ বা ‘চিন্তা’-এসবের কোনো স্বাভাবিক পরিমাপ নেই। এখানেই ট্যুরিং-এর অনুকরণ খেলা এআই-র জন্য ‘সফলতা’র সহজ মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়-যতক্ষণ মেশিন মানুষের মতো আচরণ করতে পারে, ততক্ষণ তাকে বুদ্ধিমান ধরে নেওয়া যায়।
১৯৬০-এর দশকে জোসেফ ওয়েইজেনবাউম তৈরি করেন ‘ELIZA’ নামের সহজ চ্যাটবট, যা মানুষের কথোপকথন অনুকরণ করত। অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া ছিল খুবই সরল, কিন্তু ব্যবহারকারীরা এটিকে মানবসদৃশ বলে ভুল করতেন। এই প্রবণতাকে বলা হয় ‘ELIZA effect’-যেখানে বাহ্যিক আচরণ দেখে আমরা মেশিনকে বুদ্ধিমান বলে ধরে নিই। এই ইফেক্টের কারণে পরবর্তী কয়েক দশক এআই-র অগ্রগতি মূলত প্রতীক-ভিত্তিক নিয়মের উপর নির্ভরশীল ছিল।
এআই-র আরেকটি ধারা ছিল সাইবারনেটিক্স-যেখানে ফিডব্যাক-ভিত্তিক স্বনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে বুদ্ধিমত্তার ছদ্মবেশে উপস্থাপন করা হয়। যেমন, একটি থার্মোস্ট্যাট নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ছাড়িয়ে গেলে এসি চালু করে দেয়-এটি কি বুদ্ধিমত্তা? জন ম্যাকার্থি পর্যন্ত লিখেছেন, ‘থার্মোস্ট্যাট বিশ্বাস করে ঘর ঠান্ডা বা গরম’-যদিও এটি নিছক নিয়মভিত্তিক প্রতিক্রিয়া।
এআই-র ইতিহাস ও বর্তমান প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়-আমরা এখনো অনুকরণ ও আসল বুদ্ধিমত্তার মধ্যে পার্থক্য করতে পারিনি। বাহ্যিক সাফল্যে মুগ্ধ হয়ে আমরা এআই-র গভীর সীমাবদ্ধতা ও সংকট ভুলে যাচ্ছি। ভবিষ্যতে এআই-র উন্নয়ন ও ব্যবহার নিয়ে আমাদের আরও গভীর, আন্তঃবিষয়ক আলোচনা দরকার-যাতে প্রযুক্তি কেবল অনুকরণ নয়, সত্যিকার অর্থে মানবিক মূল্যবোধ ও গভীরতা ধারণ করতে পারে।


