মালয়েশিয়ার নিয়োগ সিন্ডিকেটকে দমনের প্রস্তুতি চলছে

বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে শ্রমিক প্রেরণের নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। তবে এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত একটি কুখ্যাত সিন্ডিকেট পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই সিন্ডিকেট অতীতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের শোষণ করেছে, যার ফলে ২০২৪ সালের মে মাসে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যায়। এখন যদি একই সিন্ডিকেট আবার নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়, তাহলে আগের মতোই শ্রমিকদের দুর্ভোগের শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আগের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নিয়মিত নানা অনিয়ম দেখা গেছে। সরকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ ফি ছিল ৭৮,৯৯০ টাকা, অথচ বাস্তবে একজন শ্রমিককে মালয়েশিয়া যেতে ৫.৫ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়েছে। এটি শুধু মাত্র একটি অব্যবস্থাপনা নয়, বরং একটি পরিকল্পিত শোষণ কাঠামোর প্রতিফলন। রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রশাসনিক সহায়তায় গঠিত এই সিন্ডিকেট স্বচ্ছ এবং দক্ষ নিয়োগ এজেন্সিগুলোকে পেছনে ফেলে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে।

ফলে বহু বাংলাদেশি শ্রমিক প্রতারণার শিকার হয়েছে, তারা চাকরি না পেয়ে, বেতন না পেয়ে বা কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হয়েছে। অনেকে ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় প্রায় ৮,৯৮,৯৭০ জন বাংলাদেশি কর্মরত থাকলেও, অবৈধ বা অনিয়মিত শ্রমিকদের কোন নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, গত বছর প্রায় ১ থেকে ২ লাখ শ্রমিক বেকার অবস্থায় ছিল।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৃহস্পতিবার মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের নেতৃত্বে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন। বৈঠকে মালয়েশিয়া “বড় পরিসরে” বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগে নীতিগতভাবে সম্মতি জানিয়েছে এবং তাদের মজুরি, নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে, সরকার প্রায় ১৮,০০০ শ্রমিককে অগ্রাধিকার দিতে চায়, যারা ২০২৪ সালের মে মাসের মধ্যে মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু টিকিট সংকট বা নিয়োগকর্তা কালো তালিকাভুক্ত হওয়ায় যেতে পারেনি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র এই শ্রমিকদের নয়, বরং অনিয়মিত বা ‘অবৈধ’ হয়ে পড়া বহু বাংলাদেশিকেও বিবেচনায় নেওয়া উচিত, যাদের এই পরিস্থিতিতে পড়ার পেছনে তাদের কোনো দোষ নেই। অনেক সময় নিয়োগকর্তা ভিসা নবায়ন করে না বা পাসপোর্ট নবায়নের সমস্যা দেখা দেয়। আবার কিছু ভুয়া কোম্পানি চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষকে প্রতারিত করে।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় কাজ হলো — নিশ্চিত করা যে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোন সিন্ডিকেট যেন গঠিত না হয় এবং আবারও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুর্নীতি ও শোষণের সুযোগ না পায়। পাশাপাশি, মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে অনিয়মিত শ্রমিকদের নিয়োগে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করা দরকার।

এই পুরো প্রক্রিয়া সফল করতে হলে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নৈতিক নিয়োগ প্রক্রিয়া। দুই দেশের সরকারকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে যেন অতীতের অনিয়ম ও দুর্নীতি পুনরাবৃত্তি না ঘটে, এবং শ্রমিকরা প্রকৃত সুযোগ ও সুরক্ষা পায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন