৭ মে ২০২৫, উপমহাদেশের আকাশে আরেকবার বারুদের গন্ধ। ভারতের “অপারেশন সিন্দুর” পাকিস্তানের অভ্যন্তরে পরিচালিত হওয়ার পর দক্ষিণ এশিয়ার দুই পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র সরাসরি সামরিক সংঘাতে মুখোমুখি হয়। ভারত দাবি করেছে, এটি ছিল কাশ্মীরের পহেলগাঁও-এ পর্যটক হত্যার প্রতিশোধ। পাকিস্তান পাল্টা হামলা চালিয়ে ভারতীয় ড্রোন ধ্বংস ও যুদ্ধবিমান গুলি করে নামানোর দাবি করেছে। আকাশসীমা বন্ধ, রক্তাক্ত সীমান্ত, অর্থনৈতিক বিপর্যয়—এ পরিস্থিতির গভীরে কেবল ভূ-রাজনীতি নয়; রাষ্ট্রশাসনের বুনিয়াদটাই আজ প্রশ্নবিদ্ধ।
ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের ইতিহাস হল এক ধারাবাহিক দ্বন্দ্ব, যা জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় বিভাজন এবং সামরিক শক্তির উপর নির্ভরশীল। ১৯৪৭ সালে দুই রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকেই সম্পর্কের বীজে ছিল সন্দেহ, শত্রুতা এবং বিভেদ। সে থেকে কাশ্মীরের প্রশ্ন এখনও অত্যন্ত জ্বলন্ত বিষয়। ১৯৬৫, ১৯৭১, ১৯৯৯—এই তিনটি বড় যুদ্ধের প্রেক্ষিতে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক কেবল উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠেনি, বরং ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দুটি রাষ্ট্রই একে অপরকে প্রতিপক্ষ হিসেবে চিন্তা করে চলেছে।
যুদ্ধের এক ধরনের অদৃশ্য ইতিহাস চলছে—যেখানে কূটনৈতিক সাফল্য তখনই আসে যখন সামরিক সংঘাতের চাপে রাষ্ট্রগুলোর নেতৃবৃন্দ একটি শান্তিচুক্তি করতে বাধ্য হন। ১৯৭২ সালের শিমলা চুক্তি, ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধের পর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আটল বিহারী বাজপেয়ী এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের মধ্যে শান্তির শপথ— যদিও কোনো স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যুদ্ধবিরতির পরবর্তী সময়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রায়শই ভেঙে গেছে, আর দুই দেশের সম্পর্ক চরম বৈরিতার দিকে গড়িয়েছে।
ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধ শুধু সামরিক স্তরে ক্ষতি করে না, গভীর প্রভাব ফেলে দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও। যেমন, পাকিস্তানে সেনা শাসনের দীর্ঘ ইতিহাস, যেখানে সামরিক শক্তি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকে ধীরে ধীরে পুরোপুরি নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছে। এই সংঘাতগুলো পাকিস্তানে শাসকশ্রেণির ক্ষমতা ও জনসমর্থন বৃদ্ধির জন্য একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ভারতেও জাতীয়তাবাদী ধারণা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, যা রাজনৈতিক দলের জনপ্রিয়তাকে বাড়ানোর মাধ্যমে শাসনকে বৈধ করে তোলে।
এদিকে সীমান্তের উত্থান-পতন দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। পাকিস্তান ভারতের সাথে ক্রমাগত যুদ্ধের প্রস্তুতিতেটসামরিক বাজেটের বড় অংশ খরচ করে। একইভাবে, ভারতের ব্যাপারে–জাতীয় নিরাপত্তা বজায় রাখার নামে, অনেক সময়েই অভ্যন্তরীণ সমালোচনা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করার পথ প্রশস্ত হয়।
ভারত–পাকিস্তান সংঘাত কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক ক্ষমতা শাসনেও পরিবর্তন ঘটাতে পারে। চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক কৌশল ভারত ও পাকিস্তানের এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। চীন-পাকিস্তান জোট শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়ে উঠবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র-পাক বন্ডিংও কিন্তু মজবুত। এই সামরিক জোটগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা আঞ্চলিক শাসনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়াতে পারে।
এছাড়াও ভারতের জন্য আন্তর্জাতিক কূটনীতি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছেছে। বিশ্বশক্তির কাছ থেকে ভারতে শান্তি প্রক্রিয়া চলমান রাখার জন্য চাপ বাড়ছে। ভারত যদি আবারও সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে এবং তা বিশ্ব বাণিজ্য, পরমাণু নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তনসহ একাধিক কূটনৈতিক ফ্রন্টে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ রাজনৈতিক গভর্ন্যান্সের সংস্কার। দ্বিপাক্ষিক সামরিক যোগাযোগ পুনরায় স্থাপন (ডিজিএমও, শীর্ষ সামরিক সংলাপ), আঞ্চলিক শাসন কাঠামো পুনর্গঠন, কাশ্মীর–গিলগিট অঞ্চলে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ পুনরুদ্ধার, সাংবাদিকতা, সুশীল সমাজ ও জনমতের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ।
যুদ্ধ সহজ নয়, এটি শাসন ও অস্তিত্বের সর্বোচ্চ ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ। যখন দুই রাষ্ট্র, দুই শাসকগোষ্ঠী নিজেদের জনতার দায়িত্ব ভুলে কেবল ক্ষমতা ও জাতীয়তাবাদের খেলায় মত্ত হয় তখন রক্তপাত শুধু সীমান্তরেখায় নয়, রাষ্ট্রশাসনের শিরায়ও ছড়িয়ে পড়ে।
আজকের ভারত–পাকিস্তান সংঘাতের আসল প্রশ্ন তাই, কাশ্মীর আর কতোটা রক্তাক্ত হলে উভয়পক্ষের সন্তুষ্টির ষোলকলা পূর্ণ হবে? উত্তর কেবল কূটনীতির বৈঠকখানায় নয়, শাসনের নৈতিক ভিত্তিতেও খুঁজতে হবে।


