ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে এক নতুন ‘স্বর্ণযুগ’ নিয়ে আসবেন, যেখানে থাকবে কম দামে পণ্য, আরও বেশি চাকরি এবং ব্যাপক সম্পদ। এই সপ্তাহে তাঁর প্রথম প্রান্তিক (জানু–মার্চ) পারফরম্যান্স রিপোর্ট প্রকাশিত হলো এবং দেখা গেল, এই নতুন যুগ শুরুটা হয়েছে এক বিশৃঙ্খল অবস্থায়। গত তিন বছরে এই প্রথমবারের মতো দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (GDP) সংকুচিত হয়েছে, যেখানে পূর্ববর্তী সময়ে প্রবৃদ্ধি বেশ শক্তিশালী ছিল। বাণিজ্য বিকৃতি ও ভোক্তা ব্যয়ের দুর্বলতা এই ধাক্কার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মাত্র ৪৩ মিনিটের মধ্যে নিজেকে এই হতাশাজনক ফলাফলের দায় থেকে দূরে সরিয়ে নেন।
নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম Truth Social-এ ট্রাম্প লেখেন— “আমাদের দেশ দ্রুত সমৃদ্ধ হবে, তবে আমাদের অবশ্যই বাইডেনের রেখে যাওয়া ‘ওভারহ্যাং’ (অর্থনৈতিক বোঝা) থেকে মুক্তি পেতে হবে। এতে কিছুটা সময় লাগবে। এই খারাপ সংখ্যাগুলোর সাথে ট্যারিফের কোনো সম্পর্ক নেই; শুধু সে (বাইডেন) আমাদের খারাপ সংখ্যা দিয়ে গেছে। কিন্তু যখন বুম শুরু হবে, তা হবে নজিরবিহীন। ধৈর্য ধরুন!!!” ট্রাম্পের ভাষ্যে, যেকোনো খারাপ অর্থনৈতিক সূচক বাইডেনের দোষ তবে ভালো ফলাফলের কৃতিত্ব তিনি নিজেই নেন।
মার্চ মাসের শক্তিশালী চাকরির প্রতিবেদনে হোয়াইট হাউস থেকে বলা হয়— “ব্যক্তিগত খাত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্পের নেতৃত্বে ঝড়ের বেগে ফিরছে।” সেই দিন ট্রাম্প ঘোষণা দেন—“এটা ইতিমধ্যেই কাজ করছে।” কিন্তু এপ্রিল মাসের তুলনামূলক দুর্বল চাকরির প্রতিবেদনের পর তাঁর সুর কিছুটা নরম হয়ে যায়। তিনি লেখেন—“আমি যেমন বলেছিলাম, আমরা কেবল পরিবর্তন পর্যায়ে আছি, কেবল শুরু করছি!!!” তাহলে কোনটা সত্য? আমেরিকার ‘স্বর্ণযুগ’ কি ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে, নাকি আরও অপেক্ষা করতে হবে? মার্কিন পণ্যের আমদানি ৪১% বেড়ে যায়, কারণ কোম্পানিগুলো আগাম ট্যারিফ এড়াতে তৎপর হয়। একই সময়ে টেকসই পণ্যে ভোক্তা ব্যয় ৩.৪% হ্রাস পায়, কারণ ভোক্তা আস্থা কমতে থাকে।
এই প্রথম প্রান্তিকের পরিসংখ্যান দ্বিতীয় প্রান্তিক নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করে। কারণ ট্রাম্প এপ্রিলের শুরুতে বড় অংশের ট্যারিফ ঘোষণা করেন। এসব ট্যারিফ এবং এদের ঘিরে বিভ্রান্তি প্রবৃদ্ধিতে আরও বড় প্রভাব ফেলবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ট্রাম্পের ১০% বিশ্বব্যাপী পণ্যের ওপর এবং ১৪৫% চীনা পণ্যের ওপর হঠাৎ আরোপিত ট্যারিফ পরিস্থিতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে পাল্টে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন অলিভার অ্যালেন, প্যানথিওন ম্যাক্রোইকোনমিকসের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন—“ট্যারিফ আরোপের আগে বাড়তি কেনাকাটার যে উৎসাহ ছিল তা এখন দ্রুতই কমে আসবে। ভোক্তাদের খরচও কমবে আস্থা ও প্রকৃত আয়ের ওপর চাপের কারণে। পাশাপাশি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়বে, আর রপ্তানি—বিশেষ করে চীনের বাজারে—প্রভূত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
এখনও বলা যাচ্ছে না এই ট্যারিফ-নীতি অর্থনীতিকে সরাসরি মন্দার (টানা দুই প্রান্তিকের সংকোচন) দিকে নিয়ে যাবে কিনা। ট্রাম্পের শাসনামলে পরিস্থিতি দিনে দিনে পাল্টে যায়, একটি পূর্ণ প্রান্তিক তো অনেক দূরের কথা। ট্রাম্পের বক্তব্য আংশিক সঠিক এই প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি পতনের জন্য মূলত ট্যারিফ দায়ী নয়, কারণ অধিকাংশ ট্যারিফ দ্বিতীয় প্রান্তিকের শুরুতেই কার্যকর হয়েছে। বরং সম্ভাব্য ‘ট্রাম্পসেশন’-এর ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে প্রশাসনের এই ট্যারিফ প্রয়োগের ধরনে। বারবার কানাডা ও মেক্সিকোর ওপর ব্যাপক শুল্কের হুমকি, আবার ‘পারস্পরিক’ ট্যারিফ ঘোষণার পর একদিনের কম সময়েই তা প্রত্যাহার—এই ধরনের নাটকীয়তা ও বিভ্রান্তি বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে প্রবেশ করে গেছে। ভিতরে-বাইরে ব্যবসাগুলোর জন্য এটি অস্বস্তিকর।
ট্রাম্পের ট্রেজারি সচিব স্কট বেসেন্ট একে “কৌশলগত অনিশ্চয়তা” বলে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন “আমরা যখন এগিয়ে যাবো, চুক্তি ঘোষণা করবো, তখন নিশ্চিততা আসবে। কিন্তু আলোচনায় নিশ্চিততা সবসময় ভালো নয়।” কিন্তু ট্রাম্প ও তাঁর কর্মকর্তাদের কাছে এই কৌশল যতই কার্যকর মনে হোক না কেন, যারা প্রতিদিন বিল দিচ্ছে, ব্যবসা বাড়াচ্ছে বা ফসল ফলাচ্ছে তাদের জন্য ফলটা আলাদা। ট্রাম্প গত নভেম্বরে গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের ভোটারদের ব্যাপক সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছেন। রিপাবলিকানদের ওয়াশিংটনে ক্ষমতা ধরে রাখতে হলে তাঁকে এই ভোটব্যাঙ্ক টিকিয়ে রাখতে হবে।
তবে জরিপ বলছে, এই গোষ্ঠীগুলো উদ্বিগ্ন। PBS News/NPR/Marist-এর জরিপ অনুসারে, ৪৮% গ্রামীণ ভোটার ট্রাম্পের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় অসন্তুষ্ট। একইভাবে বার্ষিক আয় $৫০,০০০-এর কম এমন ৫৭% ভোটারও তাঁর পারফরম্যান্সে অসন্তুষ্ট। উদ্বেগ বাড়তে থাকায় ট্রাম্প ঝুঁকি লঘু করার চেষ্টা করছেন। সপ্তাহের এক বিচিত্র মুহূর্তে তিনি খালি দোকানের তাকের ঝুঁকিকে হালকা করে দেখান। তিনি বলেন “হয়তো বাচ্চারা ৩০টা পুতুলের বদলে ২টা পুতুল পাবে, আপনি জানেন তো। আর হয়তো এই দুইটা পুতুল আগের চেয়ে কয়েক ডলার বেশি দামি হবে।” তিনি আরও বলেন “চীনের জাহাজগুলো নানা জিনিসপত্র বোঝাই করে এসেছে, যার অনেক কিছুই কিন্তু আমাদের প্রয়োজন নেই।”
সাধারণত মার্কিন ভোক্তারাই ঠিক করেন, তাঁরা কী কিনবেন আর কী কিনবেন না তাদের প্রেসিডেন্ট নয়। এমন একজন ব্যক্তি, যার সম্পদ ও ভাবমূর্তি বিলাসিতার ওপর গড়ে উঠেছে, তাঁর মুখে এমন মন্তব্য বেশ অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে। New York Post যেটি সাধারণত ট্রাম্প-ঘেঁষা, তাদের শিরোনাম ছিল—“বার্বি কম কিনুন।” এখনও ট্রাম্পের জন্য সময় রয়েছে। তবে ইতিমধ্যেই বাইডেন ‘ওভারহ্যাং’ যুক্তি ক্লান্তিকর হয়ে উঠছে। শেষ পর্যন্ত তাঁর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার রায় দেবেন মার্কিন ভোটাররাই প্রেসিডেন্ট নন।


