সকালের এক কাপ গরম কফি বিশ্বের কয়েক কোটি মানুষের দিনের শুরুতেই এক অবিচ্ছেদ্য অভ্যাস। কিন্তু এই আরামদায়ক পানীয়টির ভবিষ্যৎ এখন আর নিশ্চিন্ত নয়। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন কফি শিল্পের ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দিচ্ছে। আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা ও রোগবালাই কফি উৎপাদনকে বিপর্যস্ত করছে। ফলে বাজারে কফির দাম বাড়ছে, উৎপাদক দেশগুলো অর্থনৈতিক চাপে পড়ছে এবং ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা ও অভ্যাসও পাল্টে যাচ্ছে।
বিশ্বের প্রধান কফি উৎপাদক দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্রাজিল, ভিয়েতনাম, কলম্বিয়া ও ইথিওপিয়া। এই দেশগুলো সাধারণত বিষুবরেখার দুই পাশে অবস্থিত এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬০০–২,০০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত পাহাড়ি অঞ্চলে কফি উৎপন্ন হয়। এই অঞ্চলে তুলনামূলক ঠান্ডা ও আর্দ্র আবহাওয়া, নির্দিষ্ট মাত্রার বৃষ্টিপাত এবং উর্বর মাটি কফি চাষের জন্য উপযুক্ত।
কিন্তু গত কয়েক দশকে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ১.২°C বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে কফি চাষের জন্য উপযোগী অঞ্চল সংকুচিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (NOAA)–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বর্তমান কফি উৎপাদনের ৫০% পর্যন্ত কমে যেতে পারে। বিশেষ করে আরাবিকা (Arabica) জাতের কফি তাপ ও রোগের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল, এটি বিশ্বব্যাপী ৬০% বাজার দখল করে আছে।
চ
কফি গাছের জন্য আদর্শ তাপমাত্রা ১৮–২৩°C। কিন্তু এখন অনেক অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ৩০°C ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ব্রাজিলে ২০২৪ সালে নজিরবিহীন খরা ও আকস্মিক তুষারপাতের ফলে আরাবিকা ফলন ৩০% কমেছে। একই সঙ্গে উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া Coffee Leaf Rust নামক ছত্রাকের বিস্তার বাড়িয়েছে।
১৯৭০–এর দশকে ল্যাটিন আমেরিকায় দেখা দেওয়া এই রোগ এখন আফ্রিকা ও এশিয়ায়ও ছড়িয়ে পড়েছে। ছত্রাকটি গাছের পাতা নষ্ট করে, ফলে গাছ দুর্বল হয় এবং ফলন কমে যায়।
অন্যদিকে Coffee Berry Borer নামক এক ক্ষতিকর পোকাও আবহাওয়ার পরিবর্তনের ফলে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। ২°C তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে এই পোকার জীবনচক্র বছরে ১–২ বার থেকে বেড়ে ৪–৫ বার হচ্ছে।
এই উৎপাদন সংকট সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারকে প্রভাবিত করছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে কফির আন্তর্জাতিক মূল্য ৪০–৪৫% পর্যন্ত বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে প্রতি পাউন্ড আরাবিকা কফির মূল্য ২.৮০ ডলার থেকে বেড়ে ৪.১০ ডলারে পৌঁছেছে।
বিশেষ করে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ—যারা বড় আমদানিকারক তাদের বাজারে কফি পানীয় ও স্পেশালটি কফির মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশেও কফি শপ সংস্কৃতি ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে। দেশে মূলত ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও ব্রাজিল থেকে রোস্ট কফি ও গ্রিন বিন আমদানি করা হয়।
বর্তমানে ইন্সট্যান্ট কফি ও স্পেশালটি কফির দাম ২০–২৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, উচ্চ আমদানী খরচ, ডলারের দাম বৃদ্ধি এবং উৎপাদক দেশের সংকটের কারণে দেশীয় বাজারে দাম বাড়তমান
বিশ্বব্যাপী গবেষকরা Heat-resistant Coffee Varieties (তাপ সহনশীল জাত) উদ্ভাবনের কাজ করছেন। ইতোমধ্যে Starmaya Hybrid এবং Centroamericano Hybrid জাতের কফি পরীক্ষামূলকভাবে চাষ হচ্ছে।
এছাড়া Agroforestry (বনভিত্তিক কৃষি) পদ্ধতি অর্থাৎ ছায়াযুক্ত পরিবেশে কফি চাষ করে উষ্ণতা কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ধরনের টেকসই কৃষি কৌশল কফি উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে সহায়ক হতে পারে।
ভোক্তাদের মধ্যেও ক্লাইমেট-স্মার্ট কফি অর্থাৎ পরিবেশবান্ধব উৎপাদিত কফির চাহিদা বাড়ছে। Fairtrade, Rainforest Alliance–এর মতো সংস্থাগুলো এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিচ্ছে।
কফি এখন আর শুধু একটি পানীয় নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, কৃষি, সংস্কৃতি ও পরিবেশের এক আন্তঃসংযুক্ত প্রতীক। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত কফি শিল্পের সংকটকে আমাদের সামনে স্পষ্ট করে তুলছে। শুধু কৃষি নয়, আমাদের খাদ্যাভ্যাস ও ভোক্তা সংস্কৃতিও যে জলবায়ুর করুণায়, সেটাও স্পষ্ট হচ্ছে।


