মানবজাতির ইতিহাসে সবচেয়ে বিস্ময়কর আবিষ্কারগুলোর মধ্যে একটি হলো “মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ”-এর সন্ধান। তিনি আমাদের সবার আদি মা, যার রক্ত ও জিন আজকের প্রতিটি মানুষের শরীরে প্রবাহিত হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে আজ থেকে প্রায় ২লক্ষ বছর আগে আফ্রিকায় এক নারী বাস করতেন, যার মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ (mtDNA) বংশপরম্পরায় টিকে আছে এবং বর্তমান বিশ্বের সকল মানুষের মধ্যে বিদ্যমান। অর্থাৎ আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে তার সন্তান।
মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ হলেন সেই নারী, যার মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ (mtDNA) আজকের সকল মানুষের মধ্যে বিদ্যমান। মাইটোকন্ড্রিয়া কোষের শক্তি উৎপাদনকারী অংশ এবং এর নিজস্ব জিনোম রয়েছে, যা শুধুমাত্র মাতৃপরম্পরায় সন্তানদের মধ্যে প্রবাহিত হয়। অর্থাৎ একজন মানুষের মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ তার মা, দাদী, পরদাদী—এইভাবে অতীতের দিকে চলে যায় এবং একসময় মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভের সাথে মিলিত হয়। তবে এটি গুরুত্বপূর্ণ যে, মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ একমাত্র নারী ছিলেন না যিনি সেই সময় বেঁচে ছিলেন। বরং তিনি এমন একজন নারী যার মাইটোকন্ড্রিয়াল বংশধারা আজ অবধি টিকে আছে। অন্যান্য নারীদের বংশধররা হয়তো সময়ের সাথে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা আধুনিক জিনতত্ত্বের পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। তারা বিভিন্ন মানুষের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে তাদের মাইটোকন্ড্রিয়াল জিনোমের তুলনা করেছেন। জিনোমের মিল-অমিল বিশ্লেষণ করে তারা দুজন মানুষের মধ্যে কতটা সম্পর্ক রয়েছে তা বের করেছেন। মাইটোকন্ড্রিয়াল জিনোমে একটি “হাইপারভেরিয়েবল রিজিয়ন” থাকে, যা দ্রুত পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তনের হার একটি “আণবিক ঘড়ি” হিসেবে কাজ করে, যা বিজ্ঞানীদেরকে জিনগত পরিবর্তনের সময়কাল নির্ণয় করতে সাহায্য করে।
গবেষণার সহ-লেখক ও পোল্যান্ডের সাইলেসিয়ান ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির ইনফরম্যাটিক্স ইনস্টিটিউটের ভাইস হেড ক্রিজটফ সাইরান বলেন, “জিন সিকোয়েন্সের পার্থক্যকে সময়ের সাথে বিবর্তনের প্রক্রিয়ায় রূপান্তর করতে হয়। এজন্য আমরা বিবর্তনের বিভিন্ন মডেল ব্যবহার করি, যেমন—জিন মিউটেশনের হার, জিনেটিক ড্রিফ্ট (জিনগত বৈচিত্র্যের আকস্মিক হারানো) ইত্যাদি।” এই গবেষণা শুধুমাত্র মানবজাতির উৎস সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বৃদ্ধি করে না, বরং এটি জিনগত রোগ, মিউটেশন এবং প্রাকৃতিক নির্বাচন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। অধ্যাপক কিমেল বলেন, “জিনগত পরিবর্তনের ধারা বোঝা চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
উদাহরণস্বরূপ ক্যান্সার, জিনগত ব্যাধি বা সংক্রামক রোগের গবেষণায় মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ বিশ্লেষণ সাহায্য করতে পারে। এছাড়াও মানবজাতির বিস্তার ও অভিযোজন সম্পর্কে জানতে এই ধরনের গবেষণা অত্যন্ত সহায়ক। মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভের পাশাপাশি বিজ্ঞানীরা “ওয়াই-ক্রোমোজোমাল আদম”-এর কথাও বলেন, যিনি সকল পুরুষের সাধারণ পূর্বপুরুষ। তবে মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ এবং ওয়াই-ক্রোমোজোমাল আদম একই সময়ে বাস করতেন না। গবেষণা অনুযায়ী, আদমের বয়স প্রায় ১২০,০০০ থেকে ১৫৬,০০০ বছর।
কিছু গবেষক মনে করেন, মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভের বয়স আরও বেশি হতে পারে। তবে রাইস ইউনিভার্সিটির এই গবেষণা পূর্বের অনিশ্চয়তা দূর করে একটি সুস্পষ্ট সময়রেখা দিয়েছে। ভবিষ্যতে আরও উন্নত জিনোমিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকরা মানব বিবর্তনের আরও সঠিক চিত্র তুলে ধরতে পারবেন । মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ শুধু একটি বৈজ্ঞানিক ধারণা নয় তিনি আমাদের সবার জিনগত মা। তার ডিএনএ আমাদের শরীরে বহন করছি আমরা প্রত্যেকে। এই গবেষণা আমাদের শেখায় আমরা সবাই একে অপরের সাথে সম্পর্কিত। জাতি, ধর্ম, দেশ—যাই হোক না কেন, জিনগতভাবে আমরা সবাই একই পরিবারের সদস্য।


