চর্যাপদ ৭ম থেকে ১২শ শতকের মধ্যে রচিত বৌদ্ধ সহজযান তান্ত্রিক সাধকদের পদসমূহের সংকলন, বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন। চর্যাপদ শব্দের অর্থ ‘আচরণ বা সাধনার গান’। এটি বাংলা, উড়িষ্যা, আসাম ও বিহারের আদি কথ্য ভাষার মিশ্রণে লেখা, যা বাংলা ভাষার পূর্বসূরী অপভ্রংশের প্রাথমিক রূপ হিসেবে বিবেচিত। চর্যাপদ শুধু সাহিত্য নয়, বরং প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও বৌদ্ধ তান্ত্রিক সহজযান ধর্মের গভীর আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিফলন।
১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের কাঠমান্ডুর রাজদরবার থেকে চর্যাপদের মূল পাণ্ডুলিপি ‘চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয়’ আবিষ্কার করেন। এতে মোট ৪৭টি পদ ছিল, যা পরে ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা বৌদ্ধ গান ও দোঁহা’ নামে প্রকাশিত হয়। চর্যাপদের ভাষা ছিল বাংলা, আসামীয়া ও উড়িষ্যার আদি কথ্য ভাষার মিশ্রণ, যেগুলো প্রাকৃত ও অপভ্রংশ ভাষার প্রভাব বহন করে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাপদের ভাষাকে ‘সন্ধ্যা ভাষা’ বা ‘আলো-আঁধারি ভাষা’ উল্লেখ করেছেন, কারণ এটি আংশিক প্রকাশিত ও আংশিক গোপনীয় অর্থ বহন করে।
চর্যাপদের কবিরা ছিলেন সহজিয়া বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য, যেমন সরহপা, শবরপা, লুইপা, কাহ্নপা, মীনপা প্রমুখ। তাঁরা বৌদ্ধ তন্ত্র ও সহজিয়া মতবাদের অনুসারী ছিলেন, যারা আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে মুক্তির পথ অনুসন্ধান করতেন। চর্যাপদে বৌদ্ধ তান্ত্রিক সাধনার মর্মবাণী কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে, যেখানে ‘মাতৃ ডাকিনী পূজা’, ‘শাকি উপাসনা’ ও ‘কায়া সাধনা’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
উড়িষ্যা অঞ্চলকে চর্যাপদের উৎপত্তিস্থল হিসেবে গণ্য করা হয়, কারণ বৌদ্ধ বজ্রযান তন্ত্র ও নারী পূজার প্রচলন এখানে ব্যাপক ছিল। ‘মাতৃ ডাকিনী পূজা’ এবং ‘কায়া সাধনা’ উড়িষ্যার বৌদ্ধ তান্ত্রিক সংস্কৃতির মূল অংশ, যা চর্যাপদে স্পষ্ট প্রতিফলিত হয়েছে। লক্ষ্মীঙ্করা ও পদ্মসম্ভবের মতো প্রভাবশালী বৌদ্ধ পণ্ডিতগণও উড়িষ্যার বৌদ্ধ তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের অন্তর্গত ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। চর্যাপদের ভাষা ও সংগীতের দিক থেকে উড়িষ্যা অঞ্চলের সাথে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। চর্যাপদের পদগুলোর রাগ ও তাল উড়িষ্যার ঐতিহ্যবাহী সংগীতের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
চর্যাপদের রাগগুলি ওডিসি সংগীতের রাগের সঙ্গে মিল রয়েছে, যা ১২শ থেকে ১৯শ শতকের ওড়িয়া ধ্রুপদী সংগীতের বিকাশে প্রভাব ফেলেছে। ভাষাগত দিক থেকে চর্যাপদ বাংলা, আসামীয়া ও উড়িষ্যার আদি কথ্য ভাষার মিশ্রণ, যা বাংলা ভাষার পূর্বসূরী হিসেবে বিবেচিত।
চর্যাপদ শুধু আধ্যাত্মিক গান নয়, তৎকালীন সমাজ ও সংস্কৃতির জীবন্ত চিত্র বহন করে। এতে বাঙালির দৈনন্দিন জীবনযাত্রার নানা দিক যেমন শিকার, নৌকা চালনা, বিয়ের রীতি, পোশাক ও অলঙ্কার, অস্ত্রশস্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়।
চর্যাপদে ব্যবহৃত শব্দ ও রূপ বাংলার আদি ভাষার ইতিহাস বুঝতে সাহায্য করে। আধ্যাত্মিক দিক থেকে চর্যাপদ বৌদ্ধ সহজযান ধর্মের তান্ত্রিক সাধনার মর্মবাণী বহন করে, যেখানে কায়া সাধনা ও মুক্তির পথের বর্ণনা পাওয়া যায়।
বর্তমানে চর্যাপদ নিয়ে ভাষাবিজ্ঞানী, সাহিত্যিক ও ইতিহাসবিদরা গভীর গবেষণা করছেন। চর্যাপদ বাংলা ভাষার বিকাশ ও আদি সাহিত্যিক রীতির চিত্র তুলে ধরায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে চর্যাপদের প্রভাব স্পষ্ট, বিশেষ করে আধ্যাত্মিক ও লোকসাহিত্যিক ধারায়।
চর্যাপদ ও উড়িষ্যা বৌদ্ধ তান্ত্রিক সংস্কৃতি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এক অনন্য ও প্রাচীন অধ্যায়। চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের আদিতম নিদর্শন এবং বৌদ্ধ সহজযান তান্ত্রিক সাধনার কবিতার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক চিন্তা ও সমাজের জীবন্ত চিত্র বহন করে। উড়িষ্যা অঞ্চলের বৌদ্ধ তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে চর্যাপদের গভীর সম্পর্ক বাংলা ভাষা, সংগীত ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই সংস্কৃতি বাংলা জাতীয় ঐতিহ্যের এক অমূল্য অংশ, যা আমাদের পূর্বপুরুষদের আধ্যাত্মিক সাধনা, সাংগীতিক ঐতিহ্য ও সামাজিক জীবন সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য প্রদান করে।


