আজকের বৈশ্বিক খাদ্যাভ্যাস ও জলবায়ু সংকটের প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এসেছে, ‘আমরা কতটা মাংস খেতে পারি, যাতে পৃথিবীর পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট না হয়?’ ডেনমার্কের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক এক গবেষণার ফলাফল আমাদের ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। গবেষকরা বলছেন, যদি আমরা পৃথিবীকে টেকসই সীমার মধ্যে রাখতে চাই, তবে প্রতি সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২৫৫ গ্রাম মাংস খাওয়াই গ্রহণযোগ্য। অর্থাৎ গড়ে দৈনিক মাত্র ৩৬ গ্রাম।
গবেষণাটিতে ১ লাখেরও বেশি খাদ্যচিত্র ও পরিবেশগত উপাদান (CO₂ নিঃসরণ, ভূমি ব্যবহার, পানি ব্যবহার ইত্যাদি) বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষক দলটি একযোগে কয়েকটি ফ্যাক্টরকে গুরুত্ব দেয় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ, কৃষিজমি ব্যবহার, জৈববৈচিত্র্য ক্ষতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের গতি। গবেষণার মূল বার্তা স্পষ্ট, বিশেষ করে লাল মাংস (গরু ও ভেড়ার মাংস) উৎপাদন ও গ্রহণ পৃথিবীর উপর অসম্ভব চাপ সৃষ্টি করছে। গরু ও ভেড়া মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইড নামক গ্যাস নিঃসরণ করে, যা কার্বন ডাই–অক্সাইডের তুলনায় যথাক্রমে ৮০ গুণ ও ২৮০ গুণ বেশি তাপ আটকে রাখে।
২০২১ সালের তথ্য বলছে, গড় মার্কিন ও ইউরোপীয় নাগরিক প্রতি সপ্তাহে ১.৫-২ কেজি মাংস খেয়েছেন—যা গবেষণায় নির্ধারিত সীমার (২৫৫ গ্রাম) ছয় থেকে দশ গুণ বেশি। শুধু আমেরিকানদের খাদ্যাভ্যাস মাংস ও দুগ্ধজাত খাদ্য থেকে বছরে ১৭০ কেজি CO₂ সমতুল্য গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়। অথচ জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী, ব্যক্তিপর্যায়ে ২০৩০ সালের মধ্যে পরিবেশের ভারসাম্য রাখতে হলে বছরে মাথাপিছু মোট নিঃসরণ সীমা ২ টন CO₂–এর কম হওয়া উচিত।
গবেষণায় দেখা গেছে, মুরগি, মাছ, ডিম বা দুগ্ধজাত খাবার স্বল্প পরিমাণে গ্রহণ করলে তা এখনও টেকসই সীমার মধ্যে পড়ে, তবে গরু বা ভেড়ার মাংস উল্লেখযোগ্য পরিমাণে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরূপ প্রতি কেজি গরুর মাংস উৎপাদনে গড়ে ২৭ কেজি CO₂ সমতুল্য গ্যাস নিঃসরণ হয়, যেখানে মুরগির মাংসে মাত্র ৬.৯ কেজি। তাছাড়া গরুর মাংস উৎপাদনে ১৫ হাজার লিটার পানি ও ৩৫ বর্গমিটার ভূমি লাগে, যেখানে মুরগির জন্য এই সংখ্যা যথাক্রমে ৪৩০০ লিটার ও ৭ বর্গমিটার।
কেন এই সীমা গুরুত্বপূর্ণ?
“Planetary Boundaries” ধারণা অনুযায়ী, মানুষকে এমনভাবে খাদ্য উৎপাদন ও ভোগ করতে হবে যাতে পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্র ও জলবায়ু ক্ষয় না হয়। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, মাংস উৎপাদনের জন্য ব্যাপক জমি পরিষ্কার করতে গিয়ে বনভূমি ধ্বংস হয়, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হারায় এবং মাটি–পানি দূষণ হয়। তাছাড়া বিশ্বব্যাপী ৭০% কৃষিজমি এখন পশুখাদ্য উৎপাদনের পেছনে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সমাধান কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে ব্যক্তিগত পর্যায়ে লাল মাংস খাওয়া কমানো, উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্য গ্রহণ বৃদ্ধি, সাস্টেইনেবল কৃষি পদ্ধতি অনুসরণ এবং খাদ্য অপচয় কমাতে হবে। বিশেষ করে ‘Flexitarian diet’—অর্থাৎ প্রায়শই নিরামিষভিত্তিক খাওয়া, মাঝে মাঝে মাংস গ্রহণ—টেকসইতা ও পুষ্টির মধ্যে ভারসাম্য রাখতে সহায়ক। এছাড়া প্রোটিনের বিকল্প উৎস যেমন ডাল, বাদাম, ছোলা, সয়া, মাশরুম, এমনকি ভবিষ্যতের জন্য ইনসেক্ট প্রোটিন বা ল্যাব গ্রোণ মিটও গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠছে।
বিশ্বের জনসংখ্যা যখন ৮০০ কোটির ঘর পেরিয়েছে এবং জলবায়ু সংকট ঘনিয়ে আসছে, তখন ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাস ও নীতিনির্ধারক সিদ্ধান্ত দুই-ই গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞান এখন স্পষ্ট করে বলছে—লাল মাংসের প্রতি আমাদের আকর্ষণ কমানো না গেলে পৃথিবীর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। টেকসই ভবিষ্যতের জন্য কম মাংস, সচেতন খাদ্যাভ্যাস ও উদ্ভিদভিত্তিক বিকল্পই হতে পারে উত্তরণের পথ।


