ফলের সুবাস, চকলেটের গন্ধ কিংবা ক্যান্ডির মতো রঙিন স্বাদ, এই সব মিষ্টি মোহে মোড়ানো ই-সিগারেট আজকাল অনেকের হাতেই দেখা যায়। কিন্তু এই সাজানো মোড়কের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর বাস্তবতা, একটি মরণব্যাধি, যার নাম “popcorn lung” । সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এক কিশোর মাত্র তিন বছর গোপনে ভ্যাপ করে এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। তার কিশোর জীবনের প্রাণশক্তি ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে গেছে। চিকিৎসকদের ভাষ্যে, তার ফুসফুসের সবচেয়ে সূক্ষ্ম শ্বাসনালীগুলো স্থায়ীভাবে চিরতরে সংকুচিত হয়ে গেছে। এটি এমন এক রোগ, যা নিরবধি ধ্বংস ঘটায়। বাহ্যিক কোনো রক্ত নেই, হঠাৎ কোনো জ্বালা নেই, অথচ শরীরের ভেতরে ফুসফুসগুলো নিঃশব্দে দম নিতে ভুলে যেতে শুরু করে। আজীবনের যন্ত্রণা তার নিয়তি, আর চিকিৎসা? সীমিত, অনেক সময় হয়তো আর কোনো পথই থাকে না।
ই-সিগারেটকে অনেকেই এখন ধূমপানের “নিরাপদ” বিকল্প বলে মনে করেন। বিজ্ঞাপন, সোশ্যাল মিডিয়া আর বন্ধুদের প্রভাব মিলিয়ে তরুণরা এটির প্রতি ভয়ঙ্করভাবে ঝুঁকে পড়ছে। ফল বা চকলেটের ফ্লেভারে মোড়ানো এই ছোট ডিভাইসগুলো যেন দেখায়—স্বাস্থ্যের ক্ষতি ছাড়াই আনন্দের, স্বাধীনতার, এবং ট্রেন্ডের একটি প্রতীক। কিন্তু বাস্তবতা হলো ফ্লেভারযুক্ত ই-সিগারেটের ভ্যাপে রয়েছে শত শত রাসায়নিক উপাদান, যার মধ্যে অনেকগুলোর প্রভাব বিজ্ঞান এখনো পুরোপুরি জানেই না। এর মধ্যে কিছু কেমিক্যাল এমনও রয়েছে, যা গরম হয়ে শরীরে ঢুকলে সরাসরি ফুসফুসের কোষ ধ্বংস করতে পারে।
আমাদের একটা বড় ভুল ধারণা হলো, এ কেমিক্যাল খাওয়ার জন্য নিরাপদ, সেটি নিঃশ্বাসের মাধ্যমে নিলেও নিরাপদ হবে। অথচ বাস্তবতা একেবারেই বিপরীত। যখন এই ফ্লেভারিং কেমিক্যালগুলো গরম হয়ে ইনহেলড হয়, তখন তারা শরীরের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি রক্তপ্রবাহে পৌঁছে যায়। বিশেষত diacetyl নামের একটি ফ্লেভারিং এজেন্ট, যেটি একসময় পপকর্ন ফ্যাক্টরির শ্রমিকদের ফুসফুস ধ্বংস করে দিয়েছিল, আজ তা ই-সিগারেটের মিষ্টি গন্ধে লুকিয়ে আছে। এই কেমিক্যালটি শ্বাসনালীর দেয়ালে চিরস্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করে, একবার যা ক্ষতি হয়ে যায়, তা আর রিপেয়ার হয় না।
বাংলাদেশেও ই-সিগারেট ব্যবহারের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। অনেকে এটিকে ধূমপান ছাড়ার মাধ্যম হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ নিছক কৌতূহল বা ফ্যাশনের অংশ হিসেবে ব্যবহার করছেন। কিন্তু আমাদের দেশে এই বিষয়ে স্বাস্থ্যগত গবেষণা, সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণনীতি কিংবা জনসচেতনতা এখনো আশানুরূপ নয়। ভ্যাপিং একটি নিঃশব্দ মহামারি হয়ে উঠছে। এটি হয়তো প্রথমদিকে ঠাণ্ডা ধোঁয়া, ক্যান্ডির মতো সুগন্ধ কিংবা বন্ধুত্বের একটি অংশ হয়ে দেখা দেয়। কিন্তু ধীরে ধীরে সে ছিনিয়ে নেয় ফুসফুসের স্বাভাবিকতা, জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য।


