আপনার কখনও কি এমন অনুভূতি হয়েছে, অকারণেই বুকের ভেতর এক অজানা অস্থিরতা, যেন কিছু খারাপ ঘটতে চলেছে? হয়তো কিছুক্ষণ পরই শুনলেন কোনো দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের মৃত্যুসংবাদ, কিংবা হঠাৎ দুর্ঘটনার খবর। এই অজানা, শব্দহীন, অদৃশ্য সতর্কবার্তাকেই বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন প্রিসেন্টিমেন্ট। এক ধরনের “ভবিষ্যৎ দেখার নীরব প্রতিভা”, যেখানে আমরা অজান্তেই অনুভব করি যা এখনও ঘটেনি। প্রাচীনকাল থেকে মানুষ এই অনুভূতির অস্তিত্বের কথা বলে আসছে। রোমান সাম্রাজ্যের জেনারেলরা যুদ্ধের আগে তাদের সৈনিকদের অস্থিরতা ও স্বপ্নের ব্যাখ্যা শুনে সিদ্ধান্ত নিতেন। মধ্যযুগের ইউরোপে ‘দূরদর্শিতা’ বা ‘ফোরনোটিশ’ ক্ষমতাকে ঈশ্বরপ্রদত্ত বলে মনে করা হতো। বাংলার লোককথাতেও আমরা পাই, মা-পিতামাতারা বলতেন, “মন খারাপ লাগছে—নিশ্চয় কিছু হয়েছে।” যুগে যুগে সংস্কৃতি বদলেছে, কিন্তু এই অনুভূতি থেকেই গেছে মানুষের অবচেতন মনে।
কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান কী বলে?
১৯৯০-এর দশক থেকে কিছু সাহসী গবেষক এই রহস্যময় অনুভূতির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খুঁজতে শুরু করেন। ডিন র্যাডিন (Dean Radin), ড্যারিল বেম (Daryl Bem) প্রমুখ গবেষকরা দাবি করেন, মানুষের শরীর বিশেষ করে স্নায়ুব্যবস্থা অনেক সময় এমনভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় যা ভবিষ্যতের ঘটনাকে আগেভাগে আভাস দেয়। ডিন র্যাডিন একটি বিখ্যাত পরীক্ষা করেন যেখানে অংশগ্রহণকারীদের সামনে এলোমেলোভাবে ভালো ও খারাপ ইমেজ দেখানো হয়। দেখার আগেই গবেষকরা তাদের স্কিন কন্ডাক্ট্যান্স (electrodermal activity) মেপে নেন। আশ্চর্যজনকভাবে দেখা যায়, খারাপ ছবি দেখার ঠিক আগে তাদের ত্বকের বৈদ্যুতিক প্রতিক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটছে, কিন্তু ভালো ছবির আগে তেমন হচ্ছে না।
অন্য এক গবেষণায়, হার্ট রেট এবং ব্রেন ওয়েভও আগেভাগে সংকেত পাঠানোর ইঙ্গিত দেয়। যেন শরীর জানে কিছু আসছে, অথচ মস্তিষ্ক তখনও জানে না।
তবে এই গবেষণাগুলোকে কেন্দ্র করে প্রবল বিতর্কও রয়েছে। অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, এসব ফলাফল হতে পারে ছোট স্যাম্পল সাইজ, পরীক্ষার নকশার ত্রুটি বা পরিসংখ্যানগত কাকতালীয়তার ফল। তারা যুক্তি দেন মানুষ প্রাকৃতিকভাবেই খারাপ কিছুর আশঙ্কা করে থাকে—এটি বিবর্তনগতভাবে আত্মরক্ষার অংশ। তাই কখনো কখনো “সঠিক অনুমান” হলে সেটাকে বিশেষ ক্ষমতা ভাবা হয়, কিন্তু ভুল অনুমানগুলো আমরা ভুলে যাই। ড্যারিল বেম ২০১১ সালে তার গবেষণাপত্র “Feeling the Future” প্রকাশের পর একদিকে যেমন আলোড়ন সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে প্রচণ্ড সমালোচনাও হয়। বিজ্ঞান সাময়িকীগুলোতে প্রশ্ন ওঠে “প্রিসেন্টিমেন্ট কি সত্যিই ভবিষ্যতের পূর্বাভাস, নাকি কেবল আমাদের মস্তিষ্কের তৈরি ছায়া?”
অবচেতনের খেলা নাকি অজানা ইন্দ্রিয়?
সমালোচনার মধ্যেও প্রিসেন্টিমেন্ট থিওরি একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে, আমাদের অবচেতন মন কি এমন কোনো তথ্যের সন্ধান পায় যা সচেতন মস্তিষ্ক বুঝতে পারে না? বিজ্ঞান বলে, মস্তিষ্ক প্রতি মুহূর্তে লক্ষ লক্ষ তথ্য গ্রহণ করে, যার এক ক্ষুদ্র অংশই আমরা সচেতনভাবে উপলব্ধি করি। তাই সম্ভাবনা থেকেই যায়, হয়তো অবচেতন মনে আমরা বাতাসের চাপ, গন্ধের ক্ষীণ পরিবর্তন, অন্যদের মুডের অদৃশ্য সংকেত ধরতে পারি—যা আসন্ন বিপদের আভাস দেয়। অথবা, হয়তো সময় নিজেই এমন এক তরল বাস্তবতা যেখানে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এক বিন্দুতে মিলিত হয়, আর আমাদের শরীর কোনো অজ্ঞাত পদ্ধতিতে সেই কম্পন অনুভব করতে পারে।
প্রিসেন্টিমেন্টের ব্যাপারে সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো, এর অভিজ্ঞতা প্রায়ই খুব ব্যক্তিগত। গবেষণাগারে হয়তো সবসময় ধরা পড়ে না, কিন্তু জীবনের বাস্তব মুহূর্তে আমরা এর অস্তিত্ব টের পাই। কখনো সন্তান দূরে থাকা মায়ের কাছে অকারণ অস্থিরতার মাধ্যমে বিপদের বার্তা পাঠায়, কখনো নিজের জীবনেও কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে মনে হয়, “এটা যেন না করি।” কেউ কেউ মনে করেন এটা কাকতালীয়। আবার অনেকে বলেন, এটাই আত্মার নীরব বার্তা।
প্রিসেন্টিমেন্ট থিওরি হয়তো এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি, কিন্তু এটি আমাদের ভাবতে বাধ্য করে সময়, চেতনা আর বাস্তবতার সম্পর্ক কি এতটা সোজাসাপ্টা? হতে পারে, সময় একটা সরল রেখা নয় বরং একটা জটিল জাল, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত অন্যটির সঙ্গে অদৃশ্যভাবে যুক্ত। আমরা যখন এক গভীর স্তরে প্রবেশ করি হোক সেটা স্বপ্নে, নীরব একাকিত্বে, কিংবা হঠাৎ আসা ভয়ের অনুভূতিতে তখন হয়তো সেই জালের আরেক প্রান্তের নড়াচড়া টের পাই। প্রিসেন্টিমেন্ট হলো সেই ছায়া, যা এখনো অন্ধকারে রয়ে গেছে। তা হয়তো কখনো স্পষ্ট আলোয় আসবে, হয়তো কখনো নয়। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, মানুষের হৃদয় এবং মন এখনো এমন এক রহস্যের আধার যা বিজ্ঞানের মেপে ফেলা সম্ভব হয়নি।


