অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট – আমাদের মস্তিষ্কে কী ঘটে ?

একটা অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। কি দেখছেন? ঝাপসা রঙ, অদ্ভুত সব আকার? নাকি কোন পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে? কেউ হয়তো একটা আধ্যাত্মিক অনুভূতি পাচ্ছে, আবার কেউ হয়তো পুরোটাকেই বোঝার চেষ্টা করে ক্লান্ত! শিল্পী আর দার্শনিকরা বহুদিন ধরে ভাবছেন— আর্টের মানে আসলে কী? এবার বিজ্ঞানীরাও সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নেমেছেন। সম্প্রতি একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে PNAS জার্নালে, যেখানে দেখা হয়েছে মানুষের মস্তিষ্কে অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট দেখার সময় কী ঘটে। গবেষকরা বলছেন, এই স্টাডি প্রমাণ করে “Beholder’s Share” তত্ত্বের কথা— মানে, আর্ট সম্পূর্ণ হয় দর্শকের মনের ভেতরে। তোমার নিজের স্মৃতি, আবেগ আর ভাবনা সেই ছবিকে একেক রকম মানে দেয়।
মস্তিষ্কে কী হয় যখন আর্ট দেখি?
শিল্পকর্মের প্রতি আমাদের ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া বিজ্ঞানীদের জন্য একটি জানালার মতো কাজ করে, যার মাধ্যমে বোঝা যায়, কীভাবে আমাদের মস্তিষ্ক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা গঠন করে। তো, গবেষকরা কীভাবে পরীক্ষা করলেন? এই গবেষণায় ৫৯ জন মানুষের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পরিমাপ করা হয়, ফাংশনাল ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং (fMRI) পদ্ধতি ব্যবহার করে। অংশগ্রহণকারীদের ব্রেন স্ক্যানারের ভেতরে রাখা হয়, যেখানে তারা বিমূর্ত এবং বাস্তবধর্মী — উভয় ধরনের শিল্পকর্ম দেখেন।
মূল বিষয়গুলো সংক্ষেপে বললে:
আমরা যখন কোনো শিল্পকর্ম দেখি, তখন চোখ থেকে ভিজ্যুয়াল তথ্য প্রথমে মস্তিষ্কের ভিজ্যুয়াল কর্টেক্সে যায়। সেখান থেকে তথ্যটি প্রাথমিকভাবে বিশ্লেষিত হয়। পরে উচ্চতর মস্তিষ্ক অঞ্চলে এই তথ্যের গভীরতর বিশ্লেষণ হয়, যেখানে স্মৃতি, কল্পনা এবং আত্মপরিচয়ের মতো বিষয়গুলি কাজ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, ভিজ্যুয়াল কর্টেক্সে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোনো পার্থক্য ছিল না। অর্থাৎ, তারা একই রকম দেখছিলেন।তবে মস্তিষ্কের উচ্চতর অঞ্চলে, বিশেষ করে ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্কে (যা কল্পনা, স্মৃতি রিকল এবং আত্মজ্ঞানমূলক চিন্তার সঙ্গে যুক্ত), উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে।
এর মানে হলো, শিল্প দেখার অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্য আমাদের প্রাথমিক সংবেদনশীল প্রক্রিয়ার মধ্যে নয়, বরং উচ্চতর মস্তিষ্কীয় প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়। গবেষকরা বলেন, তাদের ফলাফল নতুন প্রশ্ন তৈরি করে:
বিমূর্ত শিল্প দেখার সময় ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার পার্থক্য কি কল্পনার ক্ষমতার ভিন্নতার জন্য হয়? নাকি এটি আবেগজনিত প্রতিক্রিয়া বা নান্দনিক রুচির তারতম্যের কারণে হয়?

কেন আমরা সবাই আলাদা করে আর্ট দেখি?
গবেষকরা বলছেন, হয়তো কারো কল্পনার ক্ষমতা বেশি, তাই তারা আরো গভীর মানে খুঁজে পায়। আবার কেউ হয়তো অনুভুতি দিয়ে বেশি বিচার করে। কারো হয়তো শিল্পে মজা পাওয়ার প্রবণতা বেশি। এই প্রশ্নগুলো এখন বিজ্ঞানীদের নতুন গবেষণার খোরাক হয়েছে।
আর্ট দেখলে মস্তিষ্কের উপকার হয়?
হ্যাঁ, হয়! শিল্পকর্ম দেখা মস্তিষ্ক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। ২০০৩ সালে এক গবেষণায় দেখা যায়, লন্ডনের কর্পোরেট কর্মীরা যখন লাঞ্চ ব্রেকে আর্ট গ্যালারি পরিদর্শন করেন, তখন তাদের লালা (saliva) পরীক্ষায় কর্টিসল নামক স্ট্রেস-হরমোনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। এর মানে, তাদের মানসিক চাপ হ্রাস পায়। এই কারণেই বিমূর্ত শিল্প থেরাপিতে ব্যবহৃত হয় — যেমন PTSD এবং বিষণ্ণতার চিকিৎসায়। এটি আবেগ প্রক্রিয়াকরণ এবং চাপ কমাতে সহায়তা করে। শিল্পকর্ম দেখা শেখার জন্যও অত্যন্ত কার্যকর। প্রাচীন মানবসমাজ গুহাচিত্রের মাধ্যমে শিক্ষা ছড়িয়ে দিত, যা আজও আমাদের জন্য প্রমাণ করে শিল্পের শিক্ষামূলক শক্তি কতটা গভীর। যখন আপনি কোনো শিল্পকর্ম পর্যবেক্ষণ করেন, তখন তার অন্তর্নিহিত গল্প বা ধারণা আপনার মনে সহজেই থেকে যায়। গবেষণা বলছে, নান্দনিক অভিজ্ঞতা আমাদের কৌতূহল এবং আনন্দের অনুভূতি বাড়িয়ে শেখার গতি ত্বরান্বিত করে। একে বলা হয় “stopping for knowledge” — অর্থাৎ কোনো সুন্দর জিনিস দেখে থেমে গিয়ে তার বিষয়ে জানতে চাওয়ার প্রবণতা।

আর্ট আর বিজ্ঞান: দুনিয়া বোঝার দুই উপায়
একটু ভেবে দেখো— আসলে আর্ট আর বিজ্ঞান দুটোই চেষ্টা করে আমাদের চারপাশের দুনিয়াকে বোঝার। তবে তাদের পদ্ধতি আর প্রকাশভঙ্গি একেবারে আলাদা। আর্ট অনুভুতি জাগায়, স্মৃতি তৈরি করে, আমাদের ভাবায়। অন্যদিকে, বিজ্ঞান আমাদের যুক্তি আর পরীক্ষার মাধ্যমে বাস্তবতার ব্যাখ্যা দেয়।
দুয়েকটা প্রশ্ন দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ— যেমন, কেন আমাদের প্রত্যেকের অনুভুতি আর চিন্তাধারা আলাদা? কেন একটা ছবি কাউকে আনন্দ দেয়, আর অন্য কাউকে বিভ্রান্ত করে?
মস্তিষ্কের রহস্য উন্মোচন
কবি আর শিল্পীরা হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের মনে কি চলছে সেটা বোঝার চেষ্টা করেছেন। এখন প্রযুক্তি অনেক এগিয়ে যাওয়ায় বিজ্ঞানীরা সত্যিকারের মস্তিষ্কের ভেতর ঢুঁ মেরে দেখতে পারছেন।
গবেষকরা যেমন খুঁজছেন: কেন কেউ বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হন, আর কেউ হন না? কিংবা গর্ভাবস্থায় নারীর মস্তিষ্ক কীভাবে বদলে যায়? তবে এখনো মস্তিষ্ক কীভাবে চেতনা সৃষ্টি করে বা কীভাবে মেশিনে মানব চিন্তাভাবনা অনুকরণ করা সম্ভব — এ বিষয়ে আমরা অনেক দূরে আছি। সব প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে, মস্তিষ্ক কীভাবে সচেতনতা তৈরি করে— সেই রহস্য এখনো অনেকটাই অজানা। আমরা এখনো জানি না কিভাবে মানুষের মতো চিন্তা করতে পারে এমন যন্ত্র তৈরি করা যায়।
শেষ কথা
পরের বার আপনি যখন কোনো অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট দেখবেন, মনে রাখবেন — আপনি শুধু নিজের চোখ দিয়ে দেখছেন না, মন দিয়ে সেই ছবিটা নিজের মতো করে গড়ে তুলছেন। আর্ট আমাদের শেখায়, অনুভূতি জাগায়, প্রশ্ন তোলে— আর এভাবেই আমরা দুনিয়াকে একটু একটু করে বুঝতে শিখি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন