ভারতশাসিত কাশ্মীরের পহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলার পরে গত কয়েকদিনে ভারতের নানা জায়গায় কাশ্মীরি মানুষদের হেনস্তা, মারধর এমনকি হত্যার হুমকি দেওয়ার খবর এসেছে। এ ধরনের হেনস্তা ও হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে মূলত কাশ্মীরি ছাত্র-ছাত্রীদের যারা অন্যান্য রাজ্যে পড়াশোনা করছেন। সামাজিক মাধ্যমগুলোতেও কাশ্মীরিদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা হচ্ছে। হেনস্তার ভয়ে অনেক কাশ্মীরি ছাত্র-ছাত্রী গত কয়েকদিন ধরে ঘরবন্দি হয়ে রয়েছেন। একই সঙ্গে মুসলমান-বিরোধী ঘৃণাও ছড়ানো হচ্ছে সামাজিক এবং গণমাধ্যমে। কাশ্মীরি এবং মুসলমান-বিদ্বেষ ছড়ানোর পাশাপাশি প্রবলভাবে মৌখিক আক্রমণ করা হচ্ছে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ মানুষদেরও।
পহেলগামের হামলার জন্য ভারত সরকার পাকিস্তানের দিকে আঙুল তুলেছে, তাই ভারতের মানুষদের মধ্যেও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। নানা জায়গায় পাকিস্তানের পতাকাও পোড়ানো হচ্ছে। জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সর্বভারতীয় আহ্বায়ক নাসির খুয়েমি বিবিসি বাংলাকে বলেন — “দেরাদুন, চণ্ডীগড়, প্রয়াগরাজের মতো বড় শহরসহ বিভিন্ন স্থানে অন্তত আটটি গুরুতর মারধর, হুমকি ও হেনস্তার ঘটনা হয়েছে। এছাড়াও অসংখ্য ঘটনার খবর আসছে সারা দেশ থেকে যেখানে আমাদের রাজ্যের ছাত্রছাত্রীরা হেনস্তা বা হুমকির শিকার হওয়ার কথা জানাচ্ছেন।”
তার কথায়, “পহেলগামের হামলার পরে এমনিতেই পরিস্থিতি তেতে আছে। তার ওপরে কাশ্মীরি ছাত্রদের হয়রানির এসব ঘটনা প্রকাশ করলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে সরকারের একটা আশঙ্কা আছে। তাই একটা প্রশাসনিক চাপ আছে ঘটনাগুলো প্রকাশ না করার। আমরা চেষ্টা করছি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে তাদের মাধ্যমে যাতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়।” অথচ, পহেলগামের হামলায় যে ২৬ জন নিহত হয়েছেন, তার মধ্যে একজন কাশ্মীরিও ছিলেন যিনি মুসলমান এবং পর্যটকদের ঘোড়ায় করে ঘুরিয়ে রুটি-রুজি চালাতেন। তিনি হামলাকারীদের একজনের বন্দুক কেড়ে নিতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন বলে জানা গেছে।
আবার হামলার পরে স্থানীয়রা আহতদের পিঠে চাপিয়ে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বা কাশ্মীরি গাড়িচালকরা পর্যটকদের দ্রুত সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, এরকম বর্ণনাও প্রকাশিত হয়েছে। ঘটনার দিনই রাতে পহেলগামের ট্যাক্সিচালকরা মোমবাতি মিছিল বের করেছিলেন, পর দিন ওই হামলার প্রতিবাদে পুরো জম্মু-কাশ্মীর জুড়েই হরতাল পালিত হয়েছে। সেখানে অনেক প্রতিবাদ মিছিলও হয়েছে। আবার পহেলগামের ঘটনার দুদিন পরেই ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে গুলি বিনিময়ে নিহত হন পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা এক সেনা সদস্য। তিনি মুসলমান, নাম ঝন্টু আলি শেখ। পহেলগামের হামলার বিস্তারিত বর্ণনা সামনে আসার পর জানা যায় যে, হত্যাকারীরা পর্যটকদের ধর্মীয় পরিচয় জানতে চেয়েছিল। নিহতদের মধ্যে বেশিরভাগই হিন্দু। এই বর্ণনার পরেই মুসলমান-বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগেনি।
হিন্দুত্ববাদী প্রচারযন্ত্র সামাজিক মাধ্যমে মুসলমান বিদ্বেষ ছড়াতে থাকলেও ভারতের সব মুসলমান রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাই কিন্তু পহেলগামের হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করেছেন। কলকাতা হোক বা কাশ্মীর – মুসলমানরাও ‘সন্ত্রাসবাদ’-এর বিপক্ষে স্লোগান তুলে মিছিল করেছেন। আসামসহ কয়েকটি রাজ্য হাতে গোনা কয়েকজন মুসলমান উসকানিমূলক পোস্ট করে গ্রেফতার হয়েছেন। মুসলমানদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হিন্দুত্ববাদী প্রচার যন্ত্রের একটা নিয়মিত কাজ। কিন্তু এবার তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ মনোভাবের মানুষজনও। কিছু গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষ মানুষদের। হিন্দুত্ববাদীরা ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাভাবনার মানুষদের কটাক্ষ করে থাকেন ‘সেকু-মাকু’ বলে, অর্থাৎ ‘সেকুলার এবং মার্কসিস্ট’।
হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির গবেষক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য বলেন — “মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াতে আগেও দেখা গেছে, তবে ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তার বিরুদ্ধে এই পরিমাণ ঘৃণার বিস্ফোরণ আগে দেখিনি। আমার মনে হয় মুসলমানদের ওপরে সংখ্যাগুরুর যে বিদ্বেষ যতটা ছড়ানো যেত, সেটা করতে পারছে না হিন্দুত্ববাদী প্রচারযন্ত্র – কারণ মাঝখানে এই ধর্মনিরপেক্ষরা একটা ঢাল হয়ে কাজ করছেন। এবারের আক্রমণ তাই মুসলমানদের সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষদেরও।”


