“… এনসিপির ছাত্র-তরুণেরা দেখছেন, সংস্কার প্রশ্নে বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোকে তাঁদের মিত্র হিসেবে পাওয়ার সম্ভাবনা কম। আবার সমাজ-রাজনীতি-প্রশাসনের প্রচলিত কাঠামো বদলের জন্য চাপ তৈরির জোরও কমছে তাঁদের। পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো পরিস্থিতিকে যেকোনো উপায়ে নির্বাচনমুখী করে ফেলতে আগ্রহী।
… সংস্কার প্রশ্নে বর্তমান টানাপোড়েনে যদি পুরোনো-প্রথাগত-সংস্কারবিমুখ মনোভাব জয়ী হয় এবং তার মোকাবিলায় এনসিপি যদি অসফল হয়, তাহলে জাতির দুর্ভাগ্যের ইতিহাসে নতুন পালকই কেবল যুক্ত হবে; যেমনটি ঘটেছিল মুক্তিযুদ্ধের পর জাসদের ব্যর্থতায় এবং ১৯৯০-এর পর ‘তিন জোটের রূপরেখা’ বাস্তবায়নে তৎকালীন রাজনৈতিক দলগুলোর সচেতন উদাসীনতায়।
… নিশ্চিতভাবে এ মুহূর্তে নির্বাচন জরুরি এবং এটাই সরকারের অগ্রাধিকারে থাকা দরকার। কিন্তু ভোটের আগে রাজনৈতিক দলগুলোকে অর্থবহ এবং মৌলিক ধাঁচের কিছু সংস্কারেও রাজি হতেই হবে। কিন্তু সে রকম না হলে ছাত্র আন্দোলনের তরুণেরা কী করবেন? দল গঠন করে ভোটে লিপ্ত হওয়ার ভেতর দিয়ে তাঁরা কিছু অর্জন করতে সক্ষম কি না আদৌ?
… তারকা হোটেল আর মিডিয়ার পরিসর ছেড়ে গ্রামগঞ্জের পথঘাটে যদি গত আট মাস তাঁরা মানুষের সঙ্গে সংলাপে লিপ্ত হতেন, তাহলে ‘দ্বিতীয় রিপাবলিকের’ জন্য সমর্থন চেয়ে স্থিতিশীলতাপন্থী পুরোনো দলগুলোর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হতো না বলেই মনে হয়।
… সংস্কারের পক্ষে জনমত তৈরির জন্য যখন প্রয়োজন ছিল বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কাঠামোকে ক্রমে প্রান্তের দিকে ছড়ানো, তখন দ্রুতলয়ে একটা নাগরিক কমিটি করে ফেলে সংস্কারের সমাবেশশক্তিকে দুর্বল করে ফেলা হয়েছে বলেই কারও কারও অভিমত।
‘৩৬ জুলাই’-এর আগের হাজার হাজার মিছিলের মুখকে এখন আর কোথাও দেখা যায় না। ঢাকা, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর, উত্তরা-বসুন্ধরা-বনশ্রীর সেই শত শত নারীমুখ এখন আর কোথাও নেই। কেন তাঁদের ধরে রাখা গেল না, সেই আত্মজিজ্ঞাসা এ সময় জরুরি বৈকি, যদি তাঁদের আবার সমাবেশগুলোতে ফিরিয়ে আনতে হয়।
… ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সংগঠকদের সঙ্গে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রশক্তিরও বিচ্ছিন্নতা ঘটে গেছে। ছাত্রনেতারা সচিবালয়মুখী হওয়ামাত্র স্বাভাবিকভাবে তাঁদের ওপর নিয়োগ ও বদলির তদবির বেড়ে যায় এবং তাঁদের মূল্যবান সময় ও মনোযোগের অনেকটা ওই সব কাজকারবারে চলে যায়। এতে মাঠে, বিশেষ করে জেলা-উপজেলায় সমাবেশশক্তি গড়ার কাজটি ব্যাহত হয়।
সমাবেশশক্তি কমে যাওয়ার আরেকটা কারণ ছিল ছাত্রনেতাদের অপ্রযোজনীয়ভাবে ডানে-বামে মতাদর্শিক বিতর্কে লিপ্ত হওয়া। এই কাজে কিছু বুদ্ধিজীবীর ইন্ধন ও উৎসাহ ছিল। তাতে করে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সামাজিক চিন্তা থেকে শ্রমিক-কৃষক-দলিত সমাজের জরুরি এজেন্ডা উধাও হয়ে যায়।
আবার অভ্যুত্থানের সরকার অনেক চেষ্টা করেও তাদের প্রশাসনিক কর্মতৎপরতাকে জনপ্রত্যাশার কাছাকাছি আনতে না পারার দায়ও বর্তাচ্ছে ছাত্রনেতাদের ওপর। সরকারের ভেতর ছাত্রনেতারা থাকায় এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক-মহাপরিচালক পদে নিয়োগপ্রাপ্তদের সঙ্গে ছাত্রনেতাদের সম্পর্ককে বিবেচনায় নিয়ে জনগণের কাছে এই সরকার ও ছাত্র আন্দোলন সমার্থক হয়ে ধরা দেয়। এসবও এনসিপির এখনকার ইমেজে যুক্ত আছে।
… স্রেফ একটা নির্বাচন রাজনৈতিক অস্থিরতা-অনিশ্চয়তা কমাতে পারলেও বাংলাদেশকে কেবল সেটা আবার ১৯৯১ সালে স্থাপন করবে।…এ অবস্থায় হাজার হাজার ছাত্র-তরুণের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনবিরোধী অবস্থান না নিয়েও কীভাবে রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি ও স্বপ্নগুলো বাস্তব করে তোলা যায়।
সেই কৌশল কী হবে? শহরে প্রেস কনফারেন্স ডেকে বারবার গণপরিষদ নির্বাচন আর আওয়ামী অপকৃতির কথা বলা? মনে হয়, এ রকম কৌশল এনসিপির সমাবেশশক্তিতে র্যাডিক্যাল কোনো বদল ঘটাতে আর সক্ষম নয়।
বরং দলটির নেতৃত্ব পর্যায়ে মোটাদাগে শুদ্ধি অভিযান, আত্মজিজ্ঞাসা এবং পুনর্জাগরণ জরুরি। অভ্যুত্থানের এ রকম কারিগরদের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হলো গত আট মাসের নির্মোহ রিপোর্ট কার্ড তৈরি। প্রয়োজনে ভুল নেতৃত্ব এড়িয়ে সরাসরি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে চলে যাওয়া, নতুন ‘৩৬ জুলাই’-এর জন্য ক্রমাগত নতুন মানুষদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া।
… কুলীনদের সঙ্গে দর-কষাকষি করে বাংলাদেশে নতুন বন্দোবস্ত সম্ভব কি না, নাকি নিচুতলার মানুষদের আরও বৃহত্তর শক্তি সমাবেশ প্রয়োজন, সেটাই এখনকার ‘এক নম্বর প্রশ্ন’। বাংলাদেশ কেবল পুরোনো বন্দোবস্ত নয়, রাজনীতি করার পুরোনো রীতিরও বদল চাইছে। “


