পারস্য উপসাগরের আধুনিক শহর-রাষ্ট্রগুলো, দুবাই, দোহা, আবুধাবি—বিশ্ববাসীর চোখে আজ উন্নয়ন, বিলাসিতা ও প্রযুক্তির প্রতীক। তবে এই উজ্জ্বলতার পেছনে রয়েছে এধুলোর নিচে চাপা পড়ে যাওয়া একটি প্রকৃত দাস সমাজের ইতিহাস। ক্লাসিক্যাল ইতিহাসবিদ মোজেস ফিনলি তার “Ancient Slavery and Modern Ideology” গ্রন্থে একটি “genuine slave society” বা প্রকৃত দাস সমাজের সংজ্ঞা দিয়েছিলেন, যেখানে দাসত্ব কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর কেন্দ্রে অবস্থান করে। ফিনলির এই সংজ্ঞার আলোকে পারস্য উপসাগরের শহর-রাষ্ট্রগুলো (১৮শ থেকে ২০শ শতক পর্যন্ত) নিঃসন্দেহে দাস সমাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ওমান, বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার অঞ্চলে মূলত আফ্রিকার পূর্ব উপকূল (জাঞ্জিবার, মোজাম্বিক, সোমালিয়া, তানজানিয়া) থেকে দাস আনা হতো। দাসেরা নিয়োজিত ছিল মুক্তা আহরণে, খেজুর খামারে, অথবা অভিজাত পরিবারের গৃহস্থালিতে। মুক্তা আহরণ ছিল সবচেয়ে কষ্টকর ও বিপজ্জনক কাজ। দাসদের প্রায়শই শ্বাসরোধকারী গভীর পানিতে পাঠানো হতো, সুরক্ষা ছাড়া। এই মুক্তা শিল্প উপসাগরীয় অর্থনীতির প্রাণ ছিল, আর তা টিকে ছিল মূলত দাসশ্রমের উপর। অর্থনৈতিক উৎপাদন, সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস, এমনকি পারিবারিক ঐতিহ্যের মধ্যেও দাসত্ব গেঁথে ছিল। এই অঞ্চলের সমাজে দাসত্ব কেবল বৈধই নয়, বরং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক যুক্তির মাধ্যমে ন্যায্যতা দেওয়া হতো। যদিও ইসলাম ধর্ম দাসমুক্তিকে উৎসাহ দেয়, বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। অনেক ধর্মীয় ব্যাখ্যায় আফ্রিকানদের ‘অযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করে দাসত্বকে বৈধতা দেওয়া হতো।
দাস নারীদের উপর যৌন নিপীড়ন ছিল প্রায় স্বাভাবিক। তাদের সন্তানরাও জন্মগতভাবে দাস হিসেবে গণ্য হতো। ফলে দাসত্ব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলমান এক সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হয়ে দাঁড়ায়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসনের চাপে ১৯৫০-এর দশকে উপসাগরীয় অঞ্চলগুলো দাসপ্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করে। তবে প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল একটি কাগুজে প্রক্রিয়া। দাসপ্রথা বিলুপ্ত হলেও এর জায়গায় আসে ‘শ্রম অভিবাসন’—যার কাঠামো প্রায় অভিন্ন। শুধু ‘দাস’ শব্দটি বদলে গিয়েছে ‘কর্মী’ বা ‘ডমেস্টিক হেল্প’য়ে। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ আয়োজন বিশ্ববাসীর কাছে এই “আধুনিক দাসত্ব” পুনরায় উন্মোচিত করে। বিশাল স্টেডিয়াম, রোড, হোটেল, রেললাইন নির্মাণের নেপথ্যে কাজ করেছে লক্ষাধিক দক্ষিণ এশীয় শ্রমিক—বাংলাদেশ, নেপাল, ভারত ও পাকিস্তান থেকে আসা দরিদ্র যুবকরা।
তাদেরকে দীর্ঘ সময় অমানবিক পরিবেশে, প্রায় কোনো ছুটি ছাড়া কাজ করতে বাধ্য করা হয়। কফালা (Kafala) নামক নিয়োগব্যবস্থার ফলে তারা মালিকের অনুমতি ছাড়া চাকরি বদল বা দেশত্যাগ করতে পারে না—যা কার্যত আধুনিক দাসত্বের আইনি কাঠামো। Amnesty International ও Human Rights Watch-এর মতে, কাতারে অভিবাসী শ্রমিকদের শ্রম-পরিস্থিতি ছিল “forced labor” বা “জবরদস্তিমূলক শ্রম”-এর সমতুল্য। গার্ডিয়ান পত্রিকার অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১০ থেকে ২০২০-এর মধ্যে কাতারে কমপক্ষে ৬,৫০০ অভিবাসী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। সরকার এই সংখ্যা অস্বীকার করলেও মৃত্যুগুলোর প্রকৃত কারণ প্রকাশ করা হয়নি।
বিশ্বজুড়ে কাতারের সমালোচনা হলেও উপসাগরীয় অঞ্চলগুলোর অভ্যন্তরীণ নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। আন্তর্জাতিক চাপে কিছু আইনি সংস্কার আনলেও বাস্তব প্রয়োগ দুর্বল। অনেক শ্রমিক এখনও পাসপোর্ট জব্দের, খাদ্য ও চিকিৎসার অভাবের অভিযোগ করছেন। বলা চলে আধুনিকতা আর বিলাসের পেছনে এক দমনমূলক, নিপীড়নমূলক কাঠামো আজও টিকে আছে, যা পূর্ববর্তী দাস সমাজেরই একটি রূপান্তরিত সংস্করণ। এই অঞ্চলের ইতিহাসে দাসদের কোনো কণ্ঠ নেই। তারা ছিল অদৃশ্য নির্মাতা, যাদের কষ্টে শহর উঠেছে, কিন্তু নাম নেই কোনো ফাউন্ডেশনে। আজকের অভিবাসী শ্রমিকরাও সেই একই ছায়ায় দাঁড়িয়ে, তারা শহর গড়ে তোলে, কিন্তু নাগরিক হয় না। তারা অর্থনীতি টিকিয়ে রাখে, কিন্তু মর্যাদা পায় না।
ইতিহাস কি পুনরাবৃত্ত হচ্ছে? পারস্য উপসাগরের দাস সমাজ ইতিহাসে প্রলেপ দিয়ে ঢাকা, কিন্তু তার ছায়া আজকের শহরগুলোতে ঘুরে বেড়ায়। “দাসত্ব নেই” বলা হয়, কিন্তু যখন একজন শ্রমিক মালিকের অনুমতি ছাড়া পানি খেতে পারে না, দেশে ফিরতে পারে না, তখন সেই বক্তব্য কি আদৌ টিকে থাকে ?মধ্যপ্রাচ্যে ইদানীংকার অভিবাসী শ্রমিক সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি সেই দীর্ঘ ঐতিহাসিক দমন কাঠামোরই একটি আধুনিক রূপ।


