বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক। বাংলাদেশের পোশাক খাত অনেকদিন ধরে সস্তা শ্রমে তৈরি কম দামের পণ্য বিদেশে বিক্রি করে টিকে ছিল। কিন্তু এখন বৃহত্তম বাজার যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক বাড়ায় এই খাত বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। অনেক শিল্প নেতাই ভিয়েতনামের উত্থানকে সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন। যদিও ভিয়েতনামের ওপর আরও বেশি শুল্ক ধার্য করা হয়েছে। বাংলাদেশের ৩৭ শতাংশের তুলনায় সেখানে ৪৬ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। তবুও আশঙ্কা বাড়ছে যে, বাংলাদেশের দুর্বল বাণিজ্য কূটনীতি এবং মূল্য সংযোজন পণ্যের ধীরগতির কারণে ভিয়েতনাম বৈশ্বিক র্যাংকিং-এ এগিয়ে যেতে পারে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মতে, বাংলাদেশ ৩৮ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পোশাক রপ্তানি করে যা বিশ্বব্যাপী পোশাক রপ্তানির ৭.৪%। অন্যদিকে ভিয়েতনাম ৩১ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করে, যা বৈশ্বিক বাজারে রপ্তানির ৬%। চীনের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৬৫ বিলিয়ন ডলার এবং বাজারের অংশীদারত্ব ছিল ৩১.৬%। বাংলাদেশের কিছু কাঠামোগত শক্তি এখনো রয়ে গেছে। যেমন- স্বল্প খরচে বড় শ্রমশক্তি, একটি বৃহৎ এবং সাশ্রয়ী মূল্যের শ্রমশক্তি, তার ২৫ বিলিয়ন ডলারের প্রাথমিক টেক্সটাইল খাতের মাধ্যমে শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ, সার্টিফাইড সবুজ কারখানায় বিশ্বব্যাপী নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ডে ক্রমবর্ধমান সম্মতি।
তবে এসব ইতিবাচক দিক ধীরে ধীরে চাপা পড়ছে দীর্ঘদিনের কিছু দুর্বলতার কারণে—যার মধ্যে আছে অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, উৎপাদন ও সরবরাহ সময় বেশি, উচ্চ ঋণ ব্যয়, প্রশাসনিক জটিলতা এবং কম মূল্যের পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। বাংলাদেশকে ভিয়েতনামের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের থেকে আলাদা করে শুধু উৎপাদন খরচ নয়, বরং কৌশলগত দিকনির্দেশনাও। ভিয়েতনাম ধীরে ধীরে মূল্য সংযোজনের ধারায় এগিয়ে গেছে — পণ্যে বৈচিত্র্য এনেছে এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সুফল নিয়ে বিভিন্ন বাজারে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করেছে। এখন যখন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দু’দেশই উচ্চ হারে শুল্কের মুখে পড়েছে, তখন মূল পার্থক্য নির্ধারণ করবে — কে বেশি দক্ষতার সঙ্গে উচ্চমূল্য সংযোজন করা পণ্য দিতে পারে এবং কে কূটনৈতিকভাবে বাণিজ্যিক আলোচনা চালাতে পারে।
ভিয়েতনামের পোশাক খাতের দ্রুত প্রবৃদ্ধি অনেকাংশেই চীনা বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল — টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাতে দেশটিতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৬১ বিলিয়ন ডলার। বিপরীতে, বাংলাদেশের ৫৫ বিলিয়ন ডলারের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাতে বিদেশি বিনিয়োগ ৫ শতাংশেরও কম। পোশাক রপ্তানীকারকরা মনে করেন, মার্কিন ক্রেতারা চীনের সঙ্গে ভিয়েতনামের গভীর উৎপাদন সম্পর্ক নিয়ে সতর্ক থাকতে পারেন।তাঁদের মতে – চীনের রপ্তানি কমে যাওয়ার ফলে যে সুযোগ তৈরি হতে পারে, তা কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশকে একটি বড় দুর্বলতা দূর করতে হবে—এমএমএফ (ম্যান-মেইড ফাইবার) ভিত্তিক পোশাক তৈরির সীমিত সক্ষমতা। মার্কিন শুল্ক চাপের মুখে চীন ও ভিয়েতনাম থেকে সোর্সিং প্যাটার্ন সরে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশ নতুন অর্ডার আকর্ষণ করতে পারে। কিন্তু এটি বাংলদেশের কূটনৈতিক এবং কৌশলগত পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করবে।
তাঁরা আরো বলেন – পোশাক খাতকে তার পণ্যের ভিত্তি বৈচিত্র্যময় করতে হবে, প্রযুক্তিগত উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে এবং বিশ্বব্যাপী চাহিদার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম দক্ষ কর্মীবাহিনী গড়ে তুলতে হবে।


