সাধারণভাবে ছত্রাককে আমরা গাছ বা প্রাণীর মধ্যবর্তী একধরনের প্রাণরহিত জীব বলেই জানি—নীরব, নিষ্ক্রিয়, শুধুমাত্র খাদ্য পচিয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণা এই প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। জাপানের তোহোকু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা এমন এক ধরনের ছত্রাক Phanerochaete velutina নিয়ে পরীক্ষা করেছেন, যা আশ্চর্যজনকভাবে তার আশেপাশের পরিবেশ বুঝে সে অনুযায়ী কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে সক্ষম। এই গবেষণায় দেখা গেছে, এই ছত্রাক কেবল এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে পড়ে না বরং পরিবেশগত বিন্যাস বুঝে কোন দিকে বিস্তার করবে, কোথায় সংযোগ রাখবে এবং কোথা থেকে অতিরিক্ত অংশ গুটিয়ে নেবে—এসব সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এই আচরণ থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, ছত্রাক হয়তো একধরনের আদিম বুদ্ধিমত্তা বা প্রাথমিক সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষমতা ধারণ করে।
গবেষকরা ছত্রাকটিকে বিভিন্ন আকারের কাঠের ব্লকের উপর রাখেন, যেমন গোলাকার বিন্যাস ও ক্রুশ (ক্রস) আকৃতির বিন্যাস। ছত্রাকের মাইসেলিয়াম পর্যবেক্ষণ করে তারা দেখেন যে, এই মাইসেলিয়াম এলোমেলোভাবে ছড়ায় না। এটি কিছু অঞ্চল বাদ দিয়ে, বিশেষ কিছু অঞ্চলে শক্তিশালী সংযোগ গড়ে তোলে এবং কখনো কখনো আগেই ছড়িয়ে পড়া অংশ গুটিয়ে নিয়ে নতুন করে কৌশল সাজায়। গোলাকার বিন্যাসে দেখা গেছে ছত্রাকটির শিকড়গুলো মাঝখানে না গিয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। অপরদিকে ক্রুশাকৃতি বিন্যাসে, চার প্রান্তের ব্লকগুলোতে বেশি মনোযোগ দেয়া হয়, যেগুলো ছিলো অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী এবং মুক্ত স্থান। এই আচরণ বোঝায় যে ছত্রাকটি তার আশেপাশের কাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে এবং একধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
ছত্রাকের সিদ্ধান্তগ্রহণ কি বোঝায়?
আমরা সচরাচর সিদ্ধান্তগ্রহণকে মস্তিষ্কসম্পন্ন জীবের বৈশিষ্ট্য বলে ধরে নিই। কিন্তু Phanerochaete velutina নামক ছত্রাকটি কোন মস্তিষ্ক ছাড়াই একটি জটিল, লক্ষ্যনির্ভর কৌশল গ্রহণ করছে। এটি নিজের শক্তি অপচয় না করে, গন্তব্য অনুযায়ী নিজেকে সাজিয়ে নিচ্ছে—যা একধরনের পরিবেশবিষয়ক প্রক্রিয়াকরণ (environmental processing) এর ইঙ্গিত দেয়। এই প্রক্রিয়া বোঝায় যে ছত্রাক হয়তো তথ্য সংগ্রহ করতে পারে, স্মরণে রাখতে পারে এবং ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তা কাজে লাগাতে পারে। এর মানে দাঁড়ায়, ছত্রাকের মধ্যে একধরনের “মেমরি” বা শেখার প্রবণতা রয়েছে, যদিও তা প্রাণীদেহের মতো নিউরন-ভিত্তিক নয়।
বর্তমান সময়ে বৈজ্ঞানিক মহলে “প্রিমিটিভ ইন্টেলিজেন্স” বা আদিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। শিকার করা, ভুল থেকে শেখা, পরিবেশ অনুযায়ী অভিযোজন এবং তথ্য ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত নেওয়া—এসব অনেক দিন ধরেই প্রাণীদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য বলে মনে করা হতো। কিন্তু ছত্রাক, উদ্ভিদ এমনকি কিছু অণুজীব (microbes)-এর ক্ষেত্রেও এসব বৈশিষ্ট্য ক্রমে দেখা যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ছত্রাকের মাইসেলিয়াম জালিকা একধরনের বিকেন্দ্রীকৃত তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে। এই ব্যবস্থা প্রাণীদেহের নিউরাল নেটওয়ার্কের মতই বিভিন্ন অংশে তথ্য পাঠায়, পর্যালোচনা করে এবং সিদ্ধান্ত নেয়।
এই গবেষণার ফলাফল শুধু ছত্রাকের জীবনচক্র বুঝতেই সাহায্য করে না, বরং আমাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও বায়ো-কম্পিউটিং-এর ধারণাও বদলে দিতে পারে। ছত্রাক যেভাবে পরিবেশ বুঝে, যুক্তিযুক্তভাবে শক্তি খরচ করে এবং লক্ষ্য নির্ধারণ করে, তা মডেল হিসেবে ব্যবহার করে ভবিষ্যতের বিকেন্দ্রীকৃত কম্পিউটিং সিস্টেম তৈরি করা যেতে পারে। তাছাড়া এই ধরণের ছত্রাক পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তারা মৃত জৈব পদার্থ ভেঙে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদানে রূপান্তর করে, যা বনাঞ্চলের পুষ্টিচক্রে গুরুত্বপূর্ণ। এখন যদি তাদের চিন্তাভাবনার আদিম কাঠামোও আমরা ধরতে পারি, তাহলে তাদের ভূমিকা আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হবে।


