দিনাজপুরের বিরল উপজেলার শহরগ্রাম ইউনিয়নের বাসুদেবপুর গ্রামের বাসিন্দা ভবেশ চন্দ্র রায় গত ১৭ এপ্রিল বৃহস্পতিবার রাতে কিছুটা অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ বিরল উপজেলার ৪নং সহ-সভাপতি ছিলেন। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ হঠাৎ অসুস্থতায় তাঁর মৃত্যু বলে জানিয়েছে। পরিবারও মৃত্যুর কারণ নিয়ে নিশ্চিত নয়, তাঁরা কোন মামলা বা অভিযোগ করেননি। কিন্তু ভারত সরকার ‘হিন্দু নেতা অপহরণ ও হত্যা’-র নিন্দা জানিয়ে একে বাংলাদেশে ‘সংখ্যালঘু নির্যাতনের নমুনা’ বলে দাবি করেছে। এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ। ভারতীয় মিডিয়ায় হিন্দু নিপীড়নের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়ী করে শোরগোল চলছে।
সমকাল জানিয়েছে — ৫৫ বছর বয়স্ক ভবেশ পেশায় ছিলেন একজন কৃষক। ভবেশের মৃত্যুকে ‘হত্যা’ বলতে নারাজ পরিবার। ভবেশের ছেলে স্বপন বলেন, ‘বাবার মৃত্যু অস্বাভাবিক। তবে অসুস্থ হয়ে, নাকি আঘাতের মাধ্যমে তিনি মারা গেছেন, সেটি এখনও নিশ্চিত না।’ রোববার তাঁর শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান। এর পর মৃত্যুর ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ কিংবা অপমৃত্যু মামলা করার সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানিয়েছে পরিবার। পরিবার জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার বিকেলে মোটরসাইকেলে চারজন এসে তাঁকে বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। তবে এ সময় ভবেশকে জোর জবরদস্তি করা হয়নি। নিজের ইচ্ছাতেই তিনি মোটরসাইকেলে উঠে চলে যান। রাত ১০টার দিকে মোবাইল ফোনে পরিবারকে জানানো হয়, ‘পান-বিড়ি খাওয়ার পর ভবেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। মুমূর্ষু অবস্থায় তাঁকে ভ্যানে বাড়ির পাশের ফুলবাড়ী হাটে পাঠানো হয়েছে।’ পরে পরিবারের সদস্যরা সেখানে গিয়ে ভবেশকে অচেতন অবস্থায় পান।
এ ঘটনায় ভারতীয় গণমাধ্যমে ‘সংখ্যালঘু’ বা ‘হিন্দু হত্যা’ উল্লেখ করে প্রচারিত সংবাদের বিষয়ে পরিবার কিছু বলতে চায়নি। উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সুবল চন্দ্র রায় জানান, ভবেশ এই পরিষদের সহসভাপতি। তাঁর মৃত্যুর বিষয়ে পরিবার থেকে কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়নি। শনিবার রাতে বিরল থানার ওসি আব্দুস সবুর জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়নি। ঘটনার রাতেই নিহতের সুরতহাল প্রতিবেদন করেছে পুলিশ। লাশে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এর পর পুলিশ নিজ উদ্যোগে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ হাসপাতালে পাঠায়। প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর কারণ জানা যাবে।
শনিবার (১৯ এপ্রিল) ভবেশ চন্দ্রের মৃত্যু নিয়ে প্রেস ব্রিফিং করে দিনাজপুরের পুলিশ সুপার মারুফাত হুসাইন প্রাথমিক তদন্তের বরাত দিয়ে জানান, “বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে প্রতিবেশী রতন, আক্তারুল ইসলাম, রুবেল ইসলাম এবং মুন্না ইসলামের সঙ্গে দুইটি মোটরসাইকেলে নাড়াবাড়ী হাটে গিয়েছিলেন ভবেশ। বয়সের ব্যবধান থাকলেও তারা নিয়মিত আড্ডাবাজিসহ একসঙ্গে চলাচল করতেন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে তারা একত্রে চা-সিগারেট ও পান খাওয়ার পর কিছুটা অসুস্থবোধ করেন ভবেশ। পরে স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক লিটন ও আরেক পল্লী চিকিৎসক আব্দুর রহমানের কাছে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হয় তাকে। তার ব্লাড প্রেশার শূন্যে নেমে গিয়েছিল।”
পুলিশ সুপার জানান, বাবার অসুস্থতার খবর পেয়ে অ্যাম্বুলেন্সে তাকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন একমাত্র ছেলে স্বপন চন্দ্র রায়। সেখানে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত বলে ঘোষণা করেন। ভবেশের মৃত্যুকে ঘিরে পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ অথবা মামলা করা হয়নি বলে জানান পুলিশ সুপার। তিনি বলেন, “পরিবার চাইলে মামলা করতে পারে। তাছাড়া ময়না তদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পরে মৃত্যুর কারণ জানা সম্ভব হবে।” এদিকে এঘটনা ছড়িয়ে পড়লে ভবেশ চন্দ্রকে বাসা থেকে তুলে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। এই মৃত্যু নিয়ে একাধিক ভারতীয় মিডিয়ায় হত্যা সংক্রান্ত খবর প্রকাশিত হয়েছে। এতে এই মৃত্যুকে ঘিরে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়।
এর ধরাবাহিকতায় শনিবার (১৯ এপ্রিল) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘু নেতা ভবেশ চন্দ্র রায়ের অপহরণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি। এই হত্যাকাণ্ড একটি পদ্ধতিগত নির্যাতনের অংশ, যেখানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে হিন্দু সংখ্যালঘুদের নিয়মিতভাবে নিপীড়ন করা হচ্ছে, অথচ পূর্ববর্তী এমন ঘটনার অপরাধীরা অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে।’ ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও নিজের এক্স হ্যান্ডলে থেকে এই বার্তা শেয়ার করেন। ভারতের প্রধান বিরোধীদল কংগ্রেস-এর নেতা জয়রাম রমেশ এক্সে লিখেছেন,’এই অপহরণ ও মর্মান্তিক মৃত্যু এই অঞ্চলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতার এক উদ্বেগজনক স্মারক।’
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলছে, সংখ্যালঘুদের উপর অবর্ণনীয় অত্যাচার যেন থামার নামই নেই পড়শী দেশে। দিনাজপুরের বিরল উপজেলায় একজন হিন্দু নেতাকে অপহরণ করে নির্মমভাবে নির্যাতন করে খুন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আর এপিবিএন বলছে, ভবেশ চন্দ্রকে অপহরণের পর পিটিয়ে খুন করা হয়েছে। গোটা ঘটনায় উত্তেজনায় বাংলাদেশে নাকি নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া এনডিটিভি, দ্য হিন্দু, টাইমস অব ইন্ডিয়া ও ফাইনেন্সিয়াল এক্সপ্রেসের মত প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় ভারতীয় সংবাদমাধ্যম খবরটি গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করেছে।
ভারতের এই বিবৃতি প্রত্যাখ্যান করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। শনিবার (১৯ এপ্রিল) বাসসের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, ভবেশ চন্দ্র রায়ের মৃত্যুকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে হিন্দু সংখ্যালঘুদের উপর ‘সংগঠিত নিপীড়নের ধারাবাহিকতার’ অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে’। তিনি বলেন, ‘এই নির্দিষ্ট ঘটনায়, আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে ভুক্তভোগী পূর্বপরিচিত কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে বাইরে গিয়েছিলেন। তার পরিবার কারো সঙ্গে বাইরে যাওয়া নিয়ে কোনো সন্দেহজনক বিষয় জানাননি। সুরতহাল রিপোর্টে শরীরে কোনো দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবুও, মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করতে ভিসেরা বিশ্লেষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভিসেরা রিপোর্ট পাওয়ার পর উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আমরা সব পক্ষকে আহ্বান জানাচ্ছি, ঘটনাটি নিয়ে বিভ্রান্তিকর ও উসকানিমূলক মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকার জন্য।’
এদিকে, শনিবার (১৯ এপ্রিল) পূজা উদযাপন পরিষদের দিনাজপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক উত্তম কুমার রায় এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বিরল উপজেলার বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের ৪নং সহ-সভাপতি ভবেশ চন্দ্র রায়কে (৫২) বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।…সারা বাংলাদেশে শুধু ভবেশ চন্দ্র নয়, বিভিন্নভাবে সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার করা হচ্ছে।’ বিবৃতিতে তিনি চট্টগ্রামে স্কুলশিক্ষক শ্রী কান্তিলাল আচার্য্যকে জোর পূর্ব পদত্যাগে বাধ্য করা, মানিকগঞ্জে শিবালয় উপজেলার বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি শ্রী রথিন সাহাকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ ও নিন্দা জ্ঞাপন করেছেন। সেই সাথে দেশের বিভিন্ন জেলায় সংখ্যালঘু ও ধর্মীয় নেতাদের উপর মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের জোর দাবি জানান।


