এক চাঞ্চল্যকর গবেষণায় দেখা গেছে, ইন্টারনেটের মোট কার্যকলাপের ৫১ শতাংশই এখন আর মানুষের দ্বারা নয়, পরিচালিত হচ্ছে স্বয়ংক্রিয় প্রোগ্রাম বা বটের মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইবার সিকিউরিটি সংস্থা ইমপারভা এই তথ্য প্রকাশ করেছে। প্রযুক্তি বিষয়ক জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম টেকরাডার এই প্রতিবেদনকে সামনে এনেছে। এই পরিবর্তন নিছক সংখ্যা নয়, এটি ইন্টারনেটের চরিত্র এবং আমাদের অনলাইন নিরাপত্তা ও তথ্য ব্যবস্থাপনার চর্চাগুলোকেই আমূল বদলে দিচ্ছে। এক দশকে প্রথমবারের মতো মানুষের তুলনায় বটের সক্রিয়তা ইন্টারনেটে এগিয়ে গেছে, যা প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা।
বট হলো এমন একটি সফটওয়্যার প্রোগ্রাম যা নির্দিষ্ট কিছু কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পাদন করে। সাধারণত এগুলো মানুষের মতো করে ইন্টারনেট ব্রাউজ করে, তথ্য সংগ্রহ করে বা ওয়েবসাইটে নির্দিষ্ট ক্রিয়াকলাপ সম্পাদন করে থাকে। তবে সব বট এক ধরনের নয়।মূলত বট দুই ভাগে ভাগ করা যায়—ভালো বট এবং খারাপ বট। ভালো বটগুলো সাধারণত সার্চ ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশনের জন্য কাজ করে।যেমন, গুগল বা বিং-এর সার্চ বট ওয়েবপেজ স্ক্যান করে কনটেন্ট ইনডেক্স করে। এছাড়াও মনিটরিং বট ওয়েবসাইটের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে, সোশ্যাল মিডিয়া বট পোস্ট শিডিউল করে বা গ্রাহকদের অটো-রিপ্লাই দেয়।
ডাটা স্ক্র্যাপিং বট অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে দরকারি তথ্য সংগ্রহ করে, যেমন পণ্যের দাম তুলনা, খবর সংগ্রহ বা গবেষণা ডেটা তৈরি। এই ভালো বটগুলো ইন্টারনেটকে আরও কার্যকর ও সংগঠিত রাখতে সহায়তা করে। ইমপারভার ২০২৫ সালের রিপোর্টের কেন্দ্রে রয়েছে “ব্যাড বট” বা খারাপ বটের দৌরাত্ম্য। এসব বট ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো ওয়েবসাইট বা অনলাইন পরিষেবায় ক্ষতি সাধন করে। ভুয়া লগ ইন প্রচেষ্টা, তথ্য চুরি, ক্লিক জালিয়াতি, ওয়েবসাইটের কার্যকারিতা নষ্ট করাসহ নানা ধরনের সাইবার অপরাধে এগুলো জড়িত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, খারাপ বটগুলোর প্রভাব শিল্পভেদে ভিন্ন হলেও, বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভ্রমণ এবং খুচরা (রিটেইল) খাত।ভ্রমণ খাতে এসব বটের ট্রাফিক ৪১ শতাংশ এবং খুচরা খাতে তা ৫৯ শতাংশে পৌঁছেছে। শুধু ২০২৪ সালেই ভ্রমণ খাতের ওপর বট আক্রমণ বেড়েছে ২১ শতাংশ।
কে বা কী এই আক্রমণের পেছনে?
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের (LLM) ব্যাপক ব্যবহার খারাপ বটের বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে। বিশেষভাবে জেনারেটিভ এআইয়ের অগ্রগতি বটগুলোকে আরও বুদ্ধিমান, দ্রুত এবং মানুষের আচরণ অনুকরণে দক্ষ করে তুলেছে। বিশেষ বট ‘বাইটস্পাইডার’ কে সবচেয়ে ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এটি একাই এআই-চালিত বট আক্রমণের ৫৪ শতাংশের জন্য দায়ী। এছাড়া ‘অ্যাপলবট’ (২৬%), ‘ক্লডবট’ (১৩%) এবং ‘চ্যাটজিপিটি ইউজার বট’ (৬%) এর মধ্যে রয়েছে।
এই বটগুলোর অনেকগুলো হয়তো সরাসরি ক্ষতিকর নয়, তবে এগুলোর অনিয়ন্ত্রিত বা উদ্দেশ্যহীন ব্যবহার সমস্যার জন্ম দিতে পারে, যেমন সার্ভার ওভারলোড, ব্যান্ডউইথ নষ্ট, অথবা নিরাপত্তা ফাঁক সৃষ্টি। বটের এই আধিপত্য ইন্টারনেটকে দ্রুততর ও আরও গতিশীল করে তুললেও এর নেপথ্যে নিরাপত্তা ও নৈতিকতার বড় প্রশ্ন জেগে উঠছে। বিশেষ করে ব্যবহারকারীর তথ্য সুরক্ষা, ভুয়া কনটেন্টের বিস্তার এবং ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার স্বচ্ছতা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে। এআই-বেসড বট ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে এখন ওয়েব ডেভেলপার, সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন সমাধানের দিকে এগোতে হবে।যেমন, IP ব্লকিং, ক্যাপচা প্রযুক্তি, আচরণভিত্তিক বিশ্লেষণ ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে খারাপ বট শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করার নতুন কৌশল এখন সময়ের দাবি।
যদিও বট প্রযুক্তি ইন্টারনেটকে অধিকতর গতিশীল ও স্বয়ংক্রিয় করে তুলছে, তবুও এর অপব্যবহার নতুন সাইবার হুমকির জন্ম দিচ্ছে। ইন্টারনেট এখন আর শুধু মানুষের তৈরি জগত নয়, সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন প্রোগ্রামগুলোর শাসন বিস্তৃত হচ্ছে। তাই আমাদের সচেতনতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং নীতিগত কৌশল সবকিছুই একসাথে ব্যবহার করে এগোতে হবে যেন এই ডিজিটাল বাস্তবতাকে মানবিক, নিরাপদ ও কার্যকর রাখা যায়।


