১৯২৫ সালের ১০ এপ্রিল যখন এফ. স্কট ফিটজেরাল্ড দ্য গ্রেট গ্যাটসবি প্রকাশ করেন, তখন তিনি হয়তো ভাবেননি এই বই একদিন “দ্য গ্রেট আমেরিকান নভেল” হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। যদিও লেখক জীবিত থাকাকালীন এটি তেমন পাঠকপ্রিয়তা পায়নি, মৃত্যুর পর তার সাহিত্যকীর্তি নতুন জীবন লাভ করে। আজ এক শতাব্দী পর, গ্যাটসবি কেবল মার্কিন সাহিত্যের প্রতিনিধিত্বকারী গ্রন্থ নয়, এটি হয়ে উঠেছে মার্কিন সমাজের আত্মপর্যালোচনার এক দর্পণ। গ্যাটসবি চরিত্রটি মার্কিন স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি—বা বলা যায়, প্রতারণা। এক কৃষক পরিবারের সন্তান থেকে ধনকুবেরে পরিণত হওয়া গ্যাটসবি আসলে আমেরিকার সেই মিথ, যেখানে পরিশ্রম করলেই যে কেউ ‘সবকিছু’ পেতে পারে। কিন্তু তার এই অর্জন অবৈধ ব্যবসার উপর দাঁড়িয়ে এবং তা মূলত প্রেমিকাকে ফিরে পাওয়ার জন্য। মার্ক্সবাদী দৃষ্টিতে, গ্যাটসবি শ্রম বা নৈতিকতা নয়, বরং পুঁজির ক্ষমতা দিয়েই সমাজে স্থান করে নিতে চায়। আর এই পুঁজিবাদী কাঠামোই তাকে শেষমেশ ধ্বংস করে।
গ্যাটসবির ধ্বংসের পেছনে অ্যাটেইনমেন্ট নয়, বরং ইলিউশন—একটি কৃত্রিম স্বপ্ন যা সমাজ তাকে দিয়েছে। ২০১৪ সালে সাহিত্য সমালোচক সারাহ চার্চওয়েল লিখেছিলেন, “Gatsby believed in the green light, but what he failed to see was that it was always receding.” এই বিশ্লেষণটিই গ্যাটসবির ট্র্যাজেডিকে সর্বোচ্চ বিশ্লেষণী উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। গ্যাটসবি একমাত্র প্রেমকে বাস্তব সত্য বলে ধরে নেয়, কিন্তু বাস্তবতা তাকে প্রত্যাখ্যান করে। এই দ্বন্দ্ব অস্তিত্ববাদের কেন্দ্রে থাকা অর্থহীনতার ধারণাকে উস্কে দেয়। স্যাত্র বা সিওরানের ভাষায়, মানুষের বেঁচে থাকা একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাচক্র—ঠিক যেমন গ্যাটসবির জন্য জীবন এক অনিবার্য ফাঁদ।
উপন্যাসের কথক নিক ক্যারাওয়ে গ্যাটসবির এই অন্তঃসারশূন্যতায় ক্রমে বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠেন। তাঁর নিজের চোখে দেখা নিউ ইয়র্ক এবং লং আইল্যান্ড যেন এক আত্মাহীন, মূল্যহীন পৃথিবীর প্রতীক, যেখানে কেবল সামাজিক মুখোশ প্রদর্শনই সার্বভৌম। এটি সিওরানের “The Trouble with Being Born”-এর সাথে এক ধরনের দার্শনিক আত্মীয়তা গড়ে তোলে। ফিটজেরাল্ড নিজেও ছিলেন এই আমেরিকান ড্রিমের শিকার। তার প্রথম উপন্যাস “দিস সাইড অফ প্যারাডাইস” দিয়ে খ্যাতি অর্জনের পর তিনি এবং তার স্ত্রী জেলদা এক উন্মত্ত জীবনে প্রবেশ করেন। গ্যাটসবির মতোই ফিটজেরাল্ডও উচ্চবিত্ত জীবনের মোহে আচ্ছন্ন ছিলেন, এবং তার পতন আসে অ্যালকোহল, মানসিক বিপর্যয় ও আর্থিক দুরবস্থার মাধ্যমে। ১৯৪০ সালে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে, তিনি হৃদরোগে মৃত্যুবরণ করেন।
ততদিনে গ্যাটসবি বাজারে ব্যর্থ, বিক্রি হয়েছিল মাত্র ২৫,০০০ কপি। কিন্তু তার মৃত্যুর পরে, ধীরে ধীরে, উপন্যাসটি নতুন পাঠকের মন জয় করে নেয় এবং একসময় মডার্ন লাইব্রেরির বিশ শতকের সেরা মার্কিন উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ডেইজি, টম, কিংবা জর্ডান—তারা সবাই এক ধরনের সাংস্কৃতিক ‘নেটিভ’ যারা জানে কিভাবে অর্থ আর সামাজিক অবস্থানকে ব্যবহার করে শক্তি অর্জন করতে হয়। এই প্রসঙ্গে হারল্ড ব্লুম উল্লেখ করেন, “Gatsby was never accepted because he was not born into the game, only played it.”
গ্যাটসবির ঘরের বারান্দা থেকে দূরের ডকের সবুজ আলো উপন্যাসটির সবচেয়ে বিখ্যাত প্রতীক। এই আলো ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি, কিন্তু বাস্তবে তা অস্পৃষ্ট। এটি শুধুই প্রেমের নয়, বরং অভিজাত শ্রেণি ও সফলতা-র ধারণার প্রতীক। ফুকো বলেছিলেন, ক্ষমতা এক জায়গায় নেই—তা প্রতীক, ভাষা এবং চেতনার ভেতর ছড়িয়ে থাকে। সবুজ আলো যেন সেই ক্ষমতা ও স্বপ্নের ছায়া, যা আমরা ধরতে পারি না, কিন্তু তাড়িত হই। ২০২১ সালে বইটি পাবলিক ডোমেইনে যাওয়ার পর নানা রূপান্তর ও পুনরায় কল্পনার মাধ্যমে এর পাঠ ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই রূপান্তর প্রমাণ করে সাহিত্য কখনো বন্ধ নয়—তা পাঠকের সময় ও দৃষ্টিভঙ্গির সাথে বদলায়। দ্য গ্রেট গ্যাটসবি আজ শতবর্ষ অতিক্রম করেও প্রাসঙ্গিক—এটি একদিকে মার্কিন স্বপ্নের মিথ, অন্যদিকে অস্তিত্বের শূন্যতা; একদিকে শ্রেণিচেতনার প্রতিচ্ছবি, অন্যদিকে প্রেম ও আকাঙ্ক্ষার অন্তর্জগৎ।
এই উপন্যাসকে নতুনভাবে পাঠ করা মানে কেবল ফিটজেরাল্ডকে নয়, বরং আমাদের নিজস্ব সময় ও সমাজকেও পর্যালোচনা করা। আর এ কারণেই গ্যাটসবির সবুজ আলো কখনো নিভে না, আমাদের মনে জ্বলে।


